১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসানের পর এবার ক্রীড়াঙ্গন বা ময়দানকে রাজনীতিমুক্ত করার জোরালো ডাক দিল নতুন সরকার। দশকের পর দশক ধরে ময়দানের বিভিন্ন ক্লাব, অ্যাসোসিয়েশন ও ফেডারেশনের নেতৃত্বে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন রাজনৈতিক নেতা এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা। এবার সেই ‘দাদাগিরি’ ও পরিবারতন্ত্রের শৃঙ্খল ভাঙাই মূল চ্যালেঞ্জ নতুন প্রশাসনের কাছে।
ময়দানে ‘পরিবারতন্ত্রের’ দাপট গত দেড় দশকে ময়দানের প্রতিটি বড় সংস্থায় শাসকদলের প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। তালিকায় রয়েছেন একাধিক হেভিওয়েট নাম:
বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাই হিসেবে বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন থেকে শুরু করে রাজ্য টেবিল টেনিস সংস্থা—একের পর এক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে থেকেছেন তিনি। বিভিন্ন ফেডারেশনে তাঁর কর্তৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল ক্রীড়া মহলে।
স্বরূপ বিশ্বাস: ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস আইএফএ-র সহ-সভাপতি পদে থেকে ক্লাব ও মাঠের রাজনীতিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন।
অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সারিক আহমেদ: ইস্টবেঙ্গল বা মহমেডান স্পোর্টিংয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবেও পারিবারিক পরিচিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদ দখল করার অভিযোগ বহু পুরনো।
খোদ ক্লাব কর্তাদের কন্ঠে বিদ্রোহ এতদিন ভয়ে মুখ না খুললেও, পালাবদলের পর এখন প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ময়দানের ব্যক্তিত্বরা। বৃহস্পতিবার আশুতোষ কলেজ টেন্টে ‘ময়দান সাথী’র অনুষ্ঠানে মোহনবাগান সভাপতি দেবাশিস দত্ত বলেন, “কারুর দাদা, ভাই বা ছেলে হওয়ার সুবাদে প্রভাব খাটিয়ে পদ দখল করাটা দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের বাধ্য হয়েই এই ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে।” তাঁর এই মন্তব্য যে বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই ইঙ্গিতপূর্ণ, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কোনো সংশয় নেই।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পথে নতুন সরকার সম্প্রতি কলকাতা রোয়িং ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, “মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলে এমন কিছু লোক আছেন, যাঁরা কোনোদিন ফুটবল খেলেননি।” রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে দক্ষ ও প্রকৃত ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের দ্বারা সংস্থা পরিচালনার পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি।
একই সুর শোনা গেছে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (AIFF) সভাপতি কল্যাণ চৌবের গলাতেও। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে গত ১৫ বছরে ময়দানের কোনো অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকা হতো না। এবার সেই গণ্ডি ভেঙে সব মতের মানুষ ও দক্ষ প্রশাসকদের সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।”
ভবিষ্যৎ কী? ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাদের আশা, রাজনীতির রঙ বদলে এখন মাঠের উন্নতিই হবে লক্ষ্য। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত শ্যামল মিত্রদের মতো কর্তাদের বিদায় এবং নতুন সরকারের স্বচ্ছতার বার্তা কি সত্যিই টলিপাড়ার মতোই ময়দানেও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবে? এখন সেই উত্তরই খুঁজছে আপামর ক্রীড়াপ্রেমী।





