কলকাতার গল্ফগ্রিন থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে গ্রেফতার হওয়া যুবতী শান্তা পালকে ঘিরে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। লালবাজারের গোয়েন্দারা তাকে যত জেরা করছেন, ততই চাঞ্চল্যকর নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। জানা গেছে, শান্তা ভারত-নেপাল-চিন সীমান্তে গিয়ে সংবেদনশীল ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন, যা তাকে জ্যোতি মালহোত্রার মতো একজন গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহের তালিকায় ফেলে দিয়েছে। যদিও তিনি কোন দেশের হয়ে কাজ করছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে পুলিশ এই বিষয়ে নিবিড় তদন্ত চালাচ্ছে।
সূত্রপাত গ্রেফতারি থেকে: সন্দেহজনক নথি ও বাংলাদেশি যোগ
গত সোমবার কলকাতার গল্ফগ্রিনের একটি ফ্ল্যাট থেকে পার্ক স্ট্রিট থানার পুলিশ শান্তা পালকে গ্রেফতার করে। পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার সময় তিনি যে নথি জমা দিয়েছিলেন, তা দেখেই পুলিশের সন্দেহ হয়। সেই সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করতেই একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসে। গ্রেফতারের সময় শান্তার ফ্ল্যাট থেকে বাংলাদেশের একাধিক নথি উদ্ধার হয়, যা তার বাংলাদেশি নাগরিকত্বের প্রমাণ।
শান্তাকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে যে, তিনি ২০২৩ সালে ভারতে এসেছিলেন এবং তারপর থেকে এক সঙ্গীর সঙ্গে এখানেই বসবাস করছিলেন। তার পাসপোর্ট ও ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি ভারতেই অবস্থান করছিলেন। লালবাজার সূত্রে খবর, এই সময়ে তিনি একটি দালালচক্রের মাধ্যমে ভুয়া ভারতীয় নথি, যেমন আধার কার্ড ও রেশন কার্ড তৈরি করান। অবাক করা বিষয় হলো, বাকি নথিগুলো পার্ক স্ট্রিট থানা এলাকার হলেও, আধার কার্ডটি ছিল বর্ধমানের।
সামাজিক মাধ্যম: ভিসা পরামর্শ থেকে ভ্রমণ ভ্লগিংয়ের আড়ালে কী?
কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দারা শান্তা পালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছেন। সেখান থেকে আরও নানা বিস্ফোরক তথ্য পেয়েছে পুলিশ। লালবাজার সূত্র অনুযায়ী, তার সামাজিক মাধ্যমের পাতা ঘেঁটে দেখা গেছে যে, তিনি ভারতে ভিসা জোগাড়ে বাংলাদেশিদের পরামর্শ দিতেন। বিশেষ করে গত আগস্টের পর যখন বাংলাদেশি নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন তিনি মেডিকেল ভিসার জন্য আবেদনের পরামর্শ দিতেন।
লালবাজার সূত্রে আরও জানা গেছে, শান্তা ‘আসান ট্র্যাভেলস কলকাতা অ্যান্ড বাংলাদেশ’ নামে সামাজিক মাধ্যমে একটি পেজ খুলেছিলেন এবং সেখানে নিজের পর্যটন ব্যবসার প্রচার চালাচ্ছিলেন। এর পাশাপাশি, একটি হোটেল খোলার জন্য তিনি ভারতের কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন কিনা, ধৃতের ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে তাও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।
এছাড়াও, তার সামাজিক মাধ্যমের ছবি ও ভিডিও পোস্ট থেকে দেখা গেছে যে তিনি দিঘা থেকে শুরু করে সিকিমের গ্যাংটক পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন সংবেদনশীল অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। একজন ট্র্যাভেল ভ্লগার হিসেবে তিনি নাথু লা-ও গিয়েছিলেন এবং সেখানেই ভারত-নেপাল-চিন সীমান্তের ছবি ও ভিডিও তুলেছিলেন।
জ্যোতি মালহোত্রার ছায়া: গুপ্তচরবৃত্তির গভীর সন্দেহ
ঠিক এই জায়গাতেই তদন্তকারীরা শান্তার সঙ্গে কুখ্যাত গুপ্তচর জ্যোতি মালহোত্রার সাদৃশ্য খুঁজে পাচ্ছেন। জ্যোতি মালহোত্রা, যিনি ভারতের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন বলে প্রমাণিত, তিনিও একইভাবে ট্র্যাভেল ভ্লগার সেজে ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন এবং সংবেদনশীল ভিডিও-ছবি পাকিস্তানে পাচার করতেন। এখন প্রশ্ন উঠছে: শান্তা পালও কি একইরকমভাবে কোনো বিদেশি শক্তির জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে কলকাতা পুলিশ।
যদিও এই নিয়ে কলকাতা পুলিশের কোনো আধিকারিক প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি নন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা বিভাগের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক বলেছেন, “শান্তা পালকে যতই জেরা করা হচ্ছে, তার কাছ থেকে ততই গুরুত্বপূর্ণ নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে, যা চমকে দেওয়ার মতো। আরও ভালোভাবে গোটা বিষয়গুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যাচাই করা প্রয়োজন।”
এই ঘটনা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সুরক্ষার বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শান্তা পালের গ্রেফতারি এবং তার কার্যকলাপের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে একটি বড়সড় গুপ্তচরবৃত্তির চক্রের পর্দা ফাঁস হতে পারে বলে মনে করছে গোয়েন্দা মহল।





