পর্দার গোয়েন্দাগিরি আর বাস্তবের স্পাই লাইফ—দুটোর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা Research and Analysis Wing (RAW)-এ যোগ দেওয়ার জন্য কোনো বিজ্ঞাপন বের হয় না, নেই কোনো ওয়েবসাইট বা ফর্ম। প্রাক্তন স্পাই লাকি বিষ্টের কথায়, “আপনি RAW-কে খুঁজে পাবেন না, উপযুক্ত মনে করলে RAW-ই আপনাকে খুঁজে নেবে।”
সংস্থাটি আসলে কী? সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে থাকা এই সংস্থা ভারতের বাইরের শত্রুদের গতিবিধি ট্র্যাক করে। এদের কাজ বিদেশের মাটিতে বসে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেক এজেন্টকে দ্বিতীয় একটি ছদ্ম পরিচয় নিয়ে বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে সাধারণ মানুষের মতো মিশে থাকতে হয়।
যোগ্যতা ও নিয়োগের গোপন কৌশল: সাধারণত ২০-৩৫ বছর বয়সী ভারতীয় নাগরিকদের মধ্য থেকেই বাছাই করা হয়। তবে শুধু স্নাতক ডিগ্রি বা ভাষা জ্ঞান থাকলেই হয় না, প্রার্থীর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত রেকর্ড হতে হয় একদম স্বচ্ছ। সেনাবাহিনী, প্যারামিলিটারি বা সিভিল সার্ভিস (IAS/IPS) থেকে সেরা অফিসারদের ডেপুটেশনে নিয়ে আসা হয় এই সংস্থায়।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ইন্টারভিউ: লাকি বিষ্ট জানিয়েছেন, ‘র’-এর ইন্টারভিউ কোনো সাধারণ চাকরির ইন্টারভিউ নয়। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ। আপনাকে হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হবে এবং একের পর এক এলোমেলো প্রশ্ন করা হবে। যেমন:
-
“আপনার স্ত্রীর হাত অন্য কেউ ধরলে আপনি কী করবেন?”
-
“আপনি কি খুব রাগী?”
-
“রাতে রুটি খান না কি ভাত?”
এসব প্রশ্নের উদ্দেশ্য আপনার জ্ঞান পরীক্ষা করা নয়, বরং আপনার আবেগ নিয়ন্ত্রণ (Emotional Intelligence) এবং সামঞ্জস্যতা দেখা। আপনি যদি প্রথমে বলেন আপনি রাগী নন, কিন্তু ৩ ঘণ্টা পর অন্য একটি প্রশ্নের উত্তরে মেজাজ হারান—তবে সেখানেই আপনার সুযোগ শেষ।
সততা না কি সাহস—কোনটি আগে? সাধারণ মানুষের ধারণা গোয়েন্দা হতে গেলে খুব সাহসী হতে হয়। কিন্তু ‘র’-এর মানদণ্ড আলাদা। তাদের কাছে গুণাবলীর ক্রম হলো: ১. সততা, ২. বুদ্ধি এবং ৩. সাহস। সংস্থা মনে করে, সাহস প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায়, কিন্তু যার চারিত্রিক সততা নেই, সে যে কোনো সময় দেশকে বিক্রি করে দিতে পারে।
পরিচয় বদলানোর জাদুকর: একজন সার্থক RAW এজেন্টকে যেকোনো পরিবেশে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা রাখতে হয়। তিনি এক মুহূর্তেই বড় ব্যবসায়ী, অন্য মুহূর্তেই একজন অটো চালক হয়ে যেতে পারেন। শরীরের ভাষা থেকে শুরু করে কথা বলার ধরন—সবটাই বদলে ফেলা হয় এক লহমায়।
ভারতের এই অতন্দ্র প্রহরীদের জীবন যতটা রোমাঞ্চকর, ততটাই কঠিন ও নিঃসঙ্গ। দেশের জন্য নাম-পরিচয় বিসর্জন দিয়ে যারা কাজ করেন, তাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়াও যে অনন্য হবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।