ফেডারেশন থেকে গিল্ড—প্রতিদিনই ভাঙছে টলিপাড়া! ক্ষমতার লড়াই কি এবার শিল্পীদের রক্ত ঝরাবে?

টলিপাড়ার অন্দরে চাপা উত্তেজনা যে কোনো মুহূর্তে বড় আকার ধারণ করতে পারে, তা বৃহস্পতিবার দুপুরে আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল। টেকনিশিয়ান স্টুডিও থেকে টালিগঞ্জের ভরাট মাঠ—সারা এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হল ইট, ডিম এবং টমেটো ছোড়াছুড়ির ঘটনায়। ম্যানেজার গিল্ডের কর্তৃত্ব, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের যে বিষবাষ্প দীর্ঘ দিন ধরে টলিপাড়ার বাতাসে মিশে ছিল, বৃহস্পতিবার তা যেন বাঁধন ভাঙা রূপ নিল। পরিস্থিতি এতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, শেষ পর্যন্ত পুলিশকে লাঠি উঁচিয়ে ময়দানে নামতে হয়।

বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘সিনে প্রোডাকশন ম্যানেজার্স অ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠনের সম্পাদক মহঃ হাসান এবং সহ-সম্পাদক নিরুপম দে (বাবাই)-এর বিরুদ্ধে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ বৃহস্পতিবার চরম আকার ধারণ করে। অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, কেবল কাজের দাবি নয়, বরং ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং সাম্প্রদায়িক কুৎসা ছড়ানো হচ্ছে তাঁদের বিরুদ্ধে। হাসান-নিরুপম শিবিরের দাবি, তাঁদের ‘জঙ্গি’ এবং ‘হার্মাদ’ বলে জনসমক্ষে অপমান করা হচ্ছে। এই ঘটনায় সঞ্জয় গুহ, তাপস খাঁ-সহ ছয় জনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বর্তমান নেতৃত্ব।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই অশান্তিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২৮ মে এনটিওয়ান স্টুডিওতে ম্যানেজার সনত চট্টোপাধ্যায়ের রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনার রেশ না কাটতেই, বুধবার বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর বিবৃতি আগুনে ঘি ঢালে। পাপিয়া দেবী প্রকাশ্যেই দাবি করেন, বর্তমান সম্পাদকের পদত্যাগ করা উচিত। এরপরই বৃহস্পতিবার সকালের বৈঠক ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। অভিযোগ, বৈঠকে এমন অনেক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন, যাঁদের চলচ্চিত্রের সঙ্গে কোনও দূরতম সম্পর্ক নেই। ‘বহিরাগত’দের দৌরাত্ম্যে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

ভরাট মাঠে দুই শিবিরের মুখোমুখি সংঘর্ষে স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে ওঠে। এক পক্ষের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে বাইরের লোক এনে শিল্প পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে যে কলাকুশলীরা কাজ থেকে বঞ্চিত, তাঁদের অধিকার আদায়েই এই আন্দোলন। উত্তেজনার পারদ যখন চরমে পৌঁছায়, তখনই আকাশ থেকে পড়তে থাকে ডিম আর ইট। ‘চোর’ স্লোগান এবং বিশৃঙ্খলার জেরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ কর্মী ও শিল্পীরা।

যদিও মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এই সমস্যার সমাধানের একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সেই আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই সংঘাতের রাজনীতি শিল্পকে গ্রাস করল। রিজেন্ট পার্ক থানার বিশাল পুলিশবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও, টলিপাড়ার উদ্বেগ কমেনি। একের পর এক সংগঠন ভাঙছে, কনফেডারেশন তৈরি হচ্ছে—কিন্তু টলিপাড়ার এই ভাঙন কি আলোচনার টেবিলে মিটবে? নাকি স্টুডিওপাড়ার ভবিষ্যৎ এখন কেবল ইট-পাথরের লড়াইতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? উত্তর খুঁজছেন শিল্পজগতের মানুষ।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy