শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা এবং সরকারি দপ্তরের স্বচ্ছতা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, ঠিক তখনই সল্টলেকের করুণাময়ীর কাছে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের কার্যালয়ে পুলিশি তল্লাশি এক চাঞ্চল্যকর তথ্যের উন্মোচন করেছে। একটি সরকারি দপ্তরের অন্দরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের হাজার হাজার সদস্যপদ সংগ্রহের ফর্ম উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, এটি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অফিস নয়, বরং শাসকদলের একটি সুপরিকল্পিত পার্টি অফিস।
লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ যখন পর্ষদের স্টোর রুমে তল্লাশি চালায়, তখন সেখান থেকে থরে থরে সাজানো তৃণমূলের ওই ফর্মগুলির পাহাড় দেখতে পাওয়া যায়। এই ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়ে পর্ষদের সচিব ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি গৌতম পাল যখন দায়িত্বে ছিলেন, সেই সময় একটি ঘর তৃণমূলের প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনকে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। মূলত সেই নির্দিষ্ট ঘরটি থেকেই এই বিপুল পরিমাণ নথিপত্র ও ফর্ম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছেও বিস্তারিত অভিযোগ পৌঁছেছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে দায় এড়ানোর পালা। তৃণমূলের প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের প্রাক্তন সভাপতিকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি নিজের দায় ঝেড়ে ফেলে বলেন, “আমি যতক্ষণ দায়িত্বে ছিলাম, ততক্ষণ কোনও সদস্যপদ সংগ্রহের ফর্ম সেখানে রাখা হয়নি। পর্ষদ একটি সরকারি এবং স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। কে বা কারা, কখন ওই ফর্মগুলি সেখানে রাখল, তা কেবলমাত্র প্রাক্তন সভাপতি গৌতম পালই ভালো বলতে পারবেন।” তিনি আরও বলেন, “তৃণমূলের মন্ত্রী আমাদের সংগঠন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, তাই সেই নির্দিষ্ট সময়ে যিনি দায়িত্বে ছিলেন, তিনিই এই অনিয়মের জবাব দিতে বাধ্য।” পাশাপাশি, পর্ষদের কিছু কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর যে ব্যক্তিগত অসন্তোষ ছিল, তাও তিনি এদিন গোপন করেননি।
সল্টলেকের এই ঝাঁ-চকচকে পর্ষদ অফিস নিয়ে অতীতেও নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তবে সরকারি দপ্তরের ভেতরে রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যকলাপ এবং নথি উদ্ধারের এই ঘটনা প্রমাণ করছে যে, প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে কতটা গভীর পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, শিক্ষা দপ্তরকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ এটি। যেখানে পর্ষদকে হওয়া উচিত নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ, সেখানে অফিসের ভেতর তৃণমূলের দলীয় ফর্ম উদ্ধারের ঘটনা সাধারণ মানুষ এবং চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে এক গভীর আস্থার সংকটের জন্ম দিয়েছে। পুলিশ বাজেয়াপ্ত করা ফর্মগুলি খতিয়ে দেখছে এবং কার নির্দেশে বা কোন উদ্দেশ্যে এই সরকারি অফিসে রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালানো হচ্ছিল, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। এই ঘটনা শিক্ষা দপ্তরের অন্দরে তৃণমূলের দাপটকে আবারও জনসমক্ষে নিয়ে এল।





