মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কি এবার পশ্চিমবঙ্গে? তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের পরিস্থিতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যা নিশ্চিতভাবেই শাসকদলের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৫০ জন বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিধানসভায় স্পিকারের দ্বারস্থ হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসকদলের অন্দরে এবং রাজ্য রাজনীতিতে এখন তীব্র জল্পনা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে কি তবে শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরের মতোই তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ফসকে যাচ্ছে?
সম্প্রতি বিধানসভায় সই জালকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের ভাঙনের আঁচ স্পষ্ট হয়েছিল। মুখ্য বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি অনুযায়ী, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাই সই জাল সংক্রান্ত বিষয়টি স্পিকারকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরেই শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দুজনকে দল থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল নেতৃত্ব। কিন্তু বহিষ্কারের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই পরিস্থিতি যে গতি নিয়েছে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না।
মঙ্গলবার দুপুরে নাটকীয়ভাবে বিধানসভায় পৌঁছান ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তাঁর ঠিক পরেই বিধানসভায় প্রবেশ করেন রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায়। তাপস রায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যে এই ভাঙনের ইঙ্গিত আরও জোরালো হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাপস রায় বিস্ফোরক দাবি করেছেন, “তৃণমূল ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতো অবস্থা হল তৃণমূলের। বিধানসভার স্পিকারের কাছে প্রায় ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গিয়েছে ঋতব্রত। খেলা হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাপস রায়ের এই ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য এবং ৫০ জন বিধায়কের তৎপরতা তৃণমূলের অন্দরে এক বড়সড় বিদ্রোহের দিকেই নির্দেশ করছে। মহারাষ্ট্রে যেমন একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে শিবসেনার বড় অংশ উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে সরে গিয়েছিল, ঠিক তেমন পরিস্থিতিই পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হতে চলেছে কি না, তা নিয়ে এখন তুঙ্গে চর্চা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দুর্গে এমন ফাটল দলের অন্দরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।
বিধানসভার স্পিকারের কাছে ঠিক কী কারণে এই বিপুল সংখ্যক বিধায়ক নিয়ে ঋতব্রতরা গিয়েছেন, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা না গেলেও, বিধায়ক সংখ্যার অঙ্ক তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে ভাবিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। যদি সত্যিই ৫০ জন বিধায়ক তৃণমূলের পরিষদীয় দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেন, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার গরিষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কার মুখে পড়তে পারে। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে এখনও সরকারিভাবে এই বিষয়ে কোনো বড় প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে পরিস্থিতি যে হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
বিরোধী দলগুলো এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। তারা ইতিমধ্যেই এটিকে তৃণমূলের ‘অস্তিত্ব সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়’ বলে কটাক্ষ করেছে। এই বিদ্রোহ কেবল কি সই জালকাণ্ডের জেরে, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক ছক রয়েছে? আপাতত এই প্রশ্নই এখন রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। ঘটনার পরক্ষণেই তাপস রায়ের বিধানসভায় উপস্থিতি এবং তাঁর সরাসরি বিদ্রোহের সুর তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দলের এই বিশাল ভাঙন রুখতে শেষ পর্যন্ত কী কৌশল অবলম্বন করেন।





