আমরা আরশোলা দেখলে ঘৃণা বা ভয়ে দূরে সরে যাই, কিন্তু এই প্রাণীটির বেঁচে থাকার ক্ষমতা শুনলে আপনি চমকে উঠবেন। ডাইনোসরদের আবির্ভাবের প্রায় ১০ কোটি বছর আগে থেকে পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই পতঙ্গ। ৩২ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে হিমযুগ, উল্কাপাত, মহাপ্রলয় এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধের পরিস্থিতিও এদের টলাতে পারেনি। কিন্তু কীভাবে টিকে থাকে এই অবিনশ্বর প্রাণী? বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আরশোলার টিকে থাকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো তাদের ‘খাদ্যাভ্যাস’। এরা একেবারেই খুঁতখুঁতে নয়। চরম সংকটের সময় এরা গাছের ছাল, কাগজ, আঠা, সাবান, চুল, চামড়া এমনকি কাপড়ের টুকরো খেয়েও অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। তাদের পেটে বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা এই অদ্ভুত জিনিসগুলোকে হজম করে প্রয়োজনীয় পুষ্টিতে রূপান্তর করে। এছাড়া এরা জল ছাড়া এক সপ্তাহ এবং খাবার ছাড়া এক মাসেরও বেশি সময় অনাহারে কাটাতে পারে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের মেটাবলিজম কমিয়ে শক্তি সঞ্চয় করাই এদের বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি।
আরশোলার শরীরের গঠন সাধারণ কোনো প্রাণীর মতো নয়। অবাক করা সত্য হলো, মাথা কেটে ফেলার পরও একটি আরশোলা অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে! মানুষের মতো এরা মুখ বা নাক দিয়ে শ্বাস নেয় না, বরং শরীরের পাশে থাকা অসংখ্য সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে অক্সিজেন গ্রহণ করে। এদের স্নায়ুতন্ত্র সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকায় মাথা ছাড়াও এরা সচল থাকে। মূলত জল পান করতে না পারার কারণে জলশূন্যতায় ভুগে এদের মৃত্যু হয়।
পারমাণবিক বিকিরণ বা রেডিয়েশন সহ্য করার ক্ষমতা এদের মানুষের চেয়ে অন্তত ১৫ গুণ বেশি। এদের কোষ বিভাজনের গতি খুব ধীর হওয়ায় তেজস্ক্রিয়তা এদের ডিএনএ-র মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে না। এছাড়া এদের শরীরের শক্ত ও নমনীয় খোলস এদের যেকোনো সরু ফাটল বা দেওয়ালের কোণে আত্মগোপন করতে সাহায্য করে। এমনকি শরীরের উচ্চতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে এরা চ্যাপ্টা হয়ে লুকিয়ে পড়তে পারে।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, মানুষের তৈরি বিভিন্ন কীটনাশক বা বিষের বিরুদ্ধে এরা দ্রুত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলে। এদের দ্রুত জিন পরিবর্তনের ক্ষমতা যে কোনো শক্তিশালী পেস্ট কন্ট্রোলকেও হার মানায়। আরশোলা কোনো ‘লিভিং ফসিল’ নয়, বরং বিবর্তনের এক সেরা নমুনা। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীকে নিজের বাসযোগ্য করে তোলার এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতাই প্রমাণ করে—প্রকৃতিতে মানুষ আসার অনেক আগে থেকেই এরা ছিল, আর প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে হয়তো মানুষের বিদায়ের পরও পৃথিবী জুড়ে এরাই থাকবে।





