জানেন ছুটিই কর্মক্ষমতার আসল টনিক? সমীক্ষায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

অফিস মানেই নিরন্তর চাপ, মিটিংয়ের ভিড় আর ডেডলাইনের বোঝা। এর মধ্যেই কর্মীদের মাথায় ঘুরছে ‘পারফরম্যান্স’-এর তাগিদ, যা তাদের শরীর ও মনকে নিংড়ে ফেলে। এর মূল কারণ? পর্যাপ্ত ছুটির অভাব। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, সপ্তাহে দুই দিন বা বছরে অন্তত দু’বার দীর্ঘ ছুটি কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য অত্যাবশ্যক, যা আখেরে সংস্থারই লাভ বয়ে আনে।

‘অতিরিক্ত কাজ’ = অসুস্থতা: স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয়াবহ চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (ILO)-এর এক যৌথ প্রতিবেদন জানাচ্ছে এক আশঙ্কাজনক তথ্য: যেসব কর্মী সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, তাঁদের স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩৫%-৪০% বেড়ে যায়। এটি কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির এক ভয়াবহ চিত্র।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকনমিক রিসার্চের ২০২৪ সালের এক সমীক্ষা আরও চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছে। এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, যেসব কর্মী বছরে অন্তত একবার বড় ছুটিতে যান, কাজে ফেরার পর তাঁদের সৃজনশীলতা ২৫% এবং কর্মদক্ষতা প্রায় ৩২% বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, কর্মীদের ছুটি দিলে আদতে উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বেড়ে সংস্থারই লাভ হয়।

মস্তিষ্কও যন্ত্র নয়: ‘রিস্টার্ট বাটন’ হলো ছুটি
হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. কিম্বারলি বার্নস এই বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন, “মানুষ যন্ত্র নয়। ছুটি হলো মস্তিষ্কের রিস্টার্ট বাটন। নিয়মিত বিরতি না দিলে মস্তিষ্ক শুধু ক্লান্তই হয় না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মনোযোগ এবং উদ্ভাবনী শক্তিও হারিয়ে ফেলে।” এই ধারণা থেকেই জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেনের মতো উন্নত দেশগুলোতে ছুটি এখন কর্মসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতেও অনেক প্রথম সারির কর্পোরেট সংস্থা এই পথেই হাঁটছে।

‘সাইলেন্ট কুইটিং’: এক নতুন বিপদ
যেসব সংস্থায় কর্মীরা ছুটি নিতে দ্বিধা বোধ করেন বা নিয়মিত বিরতি পান না, সেখানে ‘বার্নআউট’ (Burnout) এবং মানসিক অবসাদ বেড়ে যায়। এর ফলে কর্মীদের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসে। অনেকেই এই অবস্থায় ‘সাইলেন্ট কুইটিং’ শুরু করেন।

‘সাইলেন্ট কুইটিং’ হলো এমন এক প্রবণতা যেখানে কর্মচারীরা চাকরি ছাড়েন না, কিন্তু কাজে আর আগের মতো মনোযোগ দেন না। তারা কেবল যতটুকু দরকার, ততটুকুই করেন, কিন্তু অফিসের প্রতি কোনো আবেগ বা অতিরিক্ত প্রচেষ্টা থাকে না। এর ফলস্বরূপ অফিসে একটি নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয় এবং কাজের মানও ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।

নেটফ্লিক্সের দৃষ্টান্ত: ছুটিই বুদ্ধিমত্তা
নেটফ্লিক্স-এর প্রাক্তন সিইও, রিড হেস্টিংসের কথায়, কর্মীদের সুস্থতা অফিসের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। তাঁর সাফ কথা, “ছুটি নেওয়া মানেই আলসেমি—এই মূর্খ ধারণা ভাঙতে হবে। ভালো কর্মী মানে ২৪ ঘণ্টা অনলাইন থাকা নয়, বরং কত সহজে কাজটি করা যায় এবং নিজের জন্য সময় বের করে নেওয়া যায়, সেটাই বুদ্ধিমত্তা।” তিনি নিজেও বছরে ছয় সপ্তাহ ছুটি নেন বলে জানিয়েছেন, যা কর্মীদের প্রতি তাঁর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে।

এই গবেষণামূলক তথ্য এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, কর্মীদের ছুটি দেওয়া এখন আর কেবল একটি প্রথা নয়, বরং একটি কার্যকর ব্যবসায়িক কৌশল, যা কর্মপরিবেশ এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সরাসরি সহায়তা করে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy