দেশের সোনা ঋণ প্রদানকারী অন্যতম শীর্ষ সংস্থা IIFL ফিন্যান্স লিমিটেডের (IIFL Finance Ltd) বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)। গ্রাহকদের বন্ধক রাখা সোনা নিলাম করার পর, ঋণের অতিরিক্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের ফেরত না দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে এই সংস্থাকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্সিয়াল কোম্পানিগুলির (NBFC) জন্য নির্ধারিত স্পষ্ট নির্দেশিকা ও নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে আইআইএফএল ফিন্যান্সকে ৩.১০ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই দেশের আর্থিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
সংবাদ সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৩৪ সালের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আইনের অধীনে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত ১১ মে, ২০২৬ তারিখে আরবিআই (RBI) এই সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা জারি করে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, ‘মাস্টার ডিরেকশন- রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্সিয়াল কোম্পানি – স্কেল বেসড রেগুলেশন) ডিরেকশনস, ২০২৩’-এর আওতায় থাকা নিয়মগুলি লংঘন করেছে আইআইএফএল ফিন্যান্স। সংস্থাটি নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকের বন্ধক রাখা সোনার গয়না নিলাম করার পর, বকেয়া ঋণের অতিরিক্ত যে টাকা উঠেছিল, তা ওই গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে ফেরত দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
সাধারণত, আর্থিক সংকটের সময়ে মানুষ নিজেদের গচ্ছিত সোনার গয়না বন্ধক রেখে গোল্ড লোন বা সোনা ঋণ নিয়ে থাকেন। কোনো কারণে ঋণগ্রহীতা যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই টাকা সুদসহ শোধ করতে না পারেন, তবে ঋণ প্রদানকারী সংস্থার কাছে সেই সোনা নিলাম করার আইনি অধিকার থাকে। কিন্তু আরবিআই-এর কড়া নিয়ম অনুয়ায়ী, নিলামের মাধ্যমে যদি বকেয়া ঋণের পরিমাণের চেয়ে বেশি টাকা আদায় হয়, তবে সেই অতিরিক্ত অর্থ বা সারপ্লাস অ্যামাউন্ট অবশ্যই মূল গ্রাহককে ফেরত দিতে হবে। কোনো সংস্থাই সেই টাকা নিজের তহবিলে রেখে দিতে পারে না। আইআইএফএল ফিন্যান্সের ক্ষেত্রে ঠিক এই নিয়মটিই লঙ্ঘিত হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে শীর্ষ ব্যাঙ্ক।
২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সংস্থার আর্থিক খতিয়ান ও কাজকর্মের ওপর ভিত্তি করে এই তদন্ত চালানো হয়। নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়টি নজরে আসার পরই আরবিআই-এর পক্ষ থেকে আইআইএফএল ফিন্যান্সকে একটি ‘কারণ দর্শানোর নোটিশ’ (Show Cause Notice) পাঠানো হয়েছিল। কেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বা জরিমানা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পরবর্তীতে সংস্থার লিখিত জবাব এবং ব্যক্তিগত শুনানির সময় তাদের কর্মকর্তাদের দেওয়া মৌখিক যুক্তি ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। কিন্তু সংস্থার দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কর্তারা। এর পরেই এই আর্থিক জরিমানা চাপানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপটি শুধুমাত্র ‘নিয়ন্ত্রক সম্মতি সংক্রান্ত ঘাটতি’ বা রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্সের গাফিলতির ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকদের সাথে উক্ত সংস্থার বর্তমান চুক্তির বৈধতার ওপর কোনো আইনি প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ, সাধারণ গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। একই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক জানিয়ে রেখেছে, এই জরিমানার অর্থ এই নয় যে আইআইএফএল ফিন্যান্সের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে আইন মোতাবেক পরবর্তী পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারে আরবিআই।





