কলকাতার রাজনীতিতে মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগের জল্পনা ঘিরেই কার্যত ভূমিকম্প শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। সেই কম্পনের রেশ এবার আছড়ে পড়ল উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এখন ভাঙনের সুর প্রকট। সূত্রের খবর, শিলিগুড়ি পুরনিগমের অন্তত ১০ জন কাউন্সিলর দল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা শাসকদলের ভিত্তিপ্রস্তর কাঁপিয়ে দিয়েছে।
মেয়র গৌতম দেবের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। যদিও গৌতম দেব সরাসরি পদত্যাগের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন, তবে তিনি জানিয়েছেন, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর থেকেই মেয়র গৌতম দেবের ওপর চাপ বাড়ছে। দলের ভেতরকার একাংশ তাঁর কাজের ধরন এবং নেতৃত্বের ওপর তীব্র ক্ষুব্ধ। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকারও অবস্থান স্পষ্ট না করে দুদিন সময় চেয়েছেন। সব মিলিয়ে, শিলিগুড়ি পুরনিগমে এখন চূড়ান্ত ধোঁয়াশা।
তৃণমূলের অন্দরের এই ক্ষোভের পেছনে মূলত দলের দুর্নীতি, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং তোলাবাজির অভিযোগকে দায়ী করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহিলা কাউন্সিলর সরাসরি ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেন, “দলের নেতারা যেখানে দুর্নীতিতে জড়িয়ে গ্রেফতার হচ্ছেন, সেখানে সাধারণ কর্মীদের পক্ষে দলে টিকে থাকা অসম্ভব। তৃণমূলের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।” এই কাউন্সিলরদের মধ্যে অনেকেই পুরনো কংগ্রেস নেতা, আবার কেউ কেউ অন্য দল থেকে তৃণমূলে এসেছিলেন। খবর অনুযায়ী, এই ১০ জন কাউন্সিলর কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
দার্জিলিং জেলা কংগ্রেস সভাপতি সুবিন ভৌমিকের দাবি, ইতিমধ্যেই অন্তত চারজন কাউন্সিলর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে তিনি বিষয়টি নিয়ে এখনই বড় ঘোষণা না করে টাউন ব্লক নেতৃত্বের ওপর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, মেয়র গৌতম দেব বিষয়টি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলছেন, “কেউ অন্য দলে যাচ্ছে এমন খবর আমার কাছে নেই।”
শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৪৭টি আসনের মধ্যে বর্তমানে ৩৭টি আসন তৃণমূলের দখলে। ফলে ১০ জন কাউন্সিলর দল ছাড়লেও বোর্ডের পতন হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংখ্যাতত্ত্বের চেয়েও বড় ধাক্কা এটি তৃণমূলের মানসিক শক্তির ওপর। শিলিগুড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে কাউন্সিলরদের গণ-দলত্যাগের জল্পনা শাসকদলের অন্দরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কলকাতা থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা যেভাবে শিলিগুড়িতে আছড়ে পড়ছে, তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল যে বড়সড় ধাক্কা খাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তা বলাই বাহুল্য। তৃণমূলের এই ভাঙন যদি সত্যি হয়, তবে উত্তরবঙ্গে শাসকদলের আধিপত্য যে প্রশ্নের মুখে পড়বে, তা নিশ্চিত।





