কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশনে ফাটল, ১৫ বছরের পুরনো নির্মাণ ত্রুটির অভিযোগ

সোমবার দুপুর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে কলকাতা মেট্রো রেলের ব্লু-লাইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তিক স্টেশন কবি সুভাষ। মেট্রো কর্তৃপক্ষ যাত্রী সুরক্ষার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ স্টেশনের চারটি স্তম্ভে ফাটল দেখা দিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাকে ঘিরে মেট্রো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি। তাদের দাবি, এই ফাটল সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির ফল নয়, বরং এর মূলে রয়েছে প্রায় ১৫ বছর আগে স্টেশন নির্মাণের সময়কার গুরুতর ত্রুটি।

১৫ বছরের পুরনো ত্রুটির অভিযোগ
আইএনটিটিইউসি পরিচালিত মেট্রো রেল ইউনিয়নের অভিযোগ, কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন এবং তার স্তম্ভগুলোতে ফাটল ধরার কারণ শুধুমাত্র বর্ষার অতিরিক্ত বৃষ্টি নয়। তাদের মতে, এই সমস্যার সূত্রপাত হয়েছিল স্টেশন তৈরির গোড়াতেই। সংগঠনের দাবি, ডাউন লাইনের এই প্রান্তিক স্টেশনটি নির্মাণের সময়ই অনেক পিলার বসে গিয়েছিল, যার ফলে আপ লাইনের প্ল্যাটফর্ম এক দিকে ঢালু হয়ে গিয়েছিল। ফলে, মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এই ঘটনা ঘটেছে বলে দায় এড়াতে পারে না।

আইএনটিটিইউসি অনুমোদিত মেট্রো রেলওয়ে প্রগতিশীল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সহ-সভাপতি শুভাশিস সেনগুপ্ত এই ঘটনাকে “অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক” আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন যে “আরও বড় কিছু ঘটে যেতে পারত।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এটা একদিনের ঘটনা নয়। প্রথম থেকেই এই স্টেশনের নির্মাণ নিয়ে সমস্যা ছিল। প্রথম থেকেই আপ প্ল্যাটফর্মের অবস্থা ঠিক ছিল না। স্টেশনের পিলারগুলি ঢালু হয়ে গিয়েছিল।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, “আজ যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা কয়েকদিনের বৃষ্টির জেরে ধস নামা, এটা ঠিক মানা যাচ্ছে না। কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশনটির বয়স মাত্র ১৫ বছর। আর এর মধ্যেই পিলারে ফাটল? আনুমানিক ৪০ হাজার মানুষ প্রতিদিন এই মেট্রো স্টেশন ব্যবহার করেন। হঠাৎ করেই পুরো পরিষেবা স্তব্ধ করে দেওয়া হলো। মেট্রো রেল কিন্তু এর দায় অস্বীকার করতে পারে না।”

জলাভূমি ভরাটের প্রশ্ন
মেট্রো রেলওয়ে মেন্স ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি সুজিত ঘোষও যাত্রী দুর্ভোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “নিঃসন্দেহে কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন ব্লু লাইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। তাই এই স্টেশনটি বন্ধ থাকলে যাত্রীদের যে সমস্যার মুখে পড়তে হবে, সেটা আর বলে দিতে হবে না।” তিনি আরও যোগ করেন যে ডায়মন্ডহারবার, লক্ষ্মীকান্তপুর, ক্যানিং লাইন থেকে আসা বহু যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করেন। সুজিত ঘোষ উল্লেখ করেন, “শুরুর সময় থেকেই এই স্টেশনের নির্মাণ নিয়ে একাধিক প্রশ্নচিহ্ন ছিল। কারণ শোনা যায় যে, জলাজমি ভরাট করে এই স্টেশনটি তৈরি করা হয়েছিল।”

এদিকে, বিজেপি অনুমোদিত ক্যালকাটা মেট্রো রেলওয়ে কর্মচারী সংঘের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ সাহার সঙ্গে ইটিভি ভারত যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও, তিনি ফোন ধরেননি।

মেরামত ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
কলকাতা মেট্রোর এক নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আধিকারিক জানিয়েছেন, “বৃষ্টির জেরেই ধস নেমে কলামের নীচের মাটি নরম হয়ে গেছে, যার ফলে আপ লাইনের প্ল্যাটফর্মের চারটি কলামে ফাটল দেখা দেয়। তাই যাত্রীদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করেই গোটা স্টেশনটি বন্ধ রাখা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, “মেট্রো ইঞ্জিনিয়াররা খতিয়ে দেখছেন। সেই মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে, ওই চারটি কলাম মেরামত করতে হবে, নাকি স্টেশনের আরও কোনো অংশ মেরামতির প্রয়োজন রয়েছে। তারপর কাজ শুরু করা হবে।” এই মুহূর্তে স্টেশনে যাত্রী পরিষেবা কবে থেকে শুরু হবে, তা বলা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

কলকাতা মেট্রো রেলের তরফে জানানো হয়েছে যে, মেরামতির কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কবি সুভাষ স্টেশন বন্ধ থাকবে। যতদিন না পর্যন্ত কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন চালু হচ্ছে, ততদিন শহিদ ক্ষুদিরাম স্টেশন থেকে মেট্রো পরিষেবা শুরু ও শেষ হবে। ক্ষুদিরাম থেকেই রেক ঘুরিয়ে দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত যাতায়াত করবে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিনের যাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং কবে এই গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনটি পুনরায় চালু হবে, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy