পহেলগাঁওয়ের ক্ষতের বদলা নিতে পাক অধিকৃত ভূখণ্ডে ভারতীয় সেনার সেই বিধ্বংসী ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আজ এক বছর পূর্ণ হলো। গত বছরের এই দিনে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী সীমান্ত পেরিয়ে যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল, তার বর্ষপূর্তিতে আজ উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জল-স্থল-আকাশ—তিন বাহিনীর প্রধানরাই তাঁদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের ছবি (DP) পরিবর্তন করে এই বিশেষ দিনটিকে স্মরণ করেছেন। ভারতের এই ‘ডিজিটাল একাত্মতা’ ইসলামাবাদের কাছে এক কড়া বার্তা বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
অপারেশন সিঁদুর: সেই রক্ত জল করা ৮৮ ঘণ্টা
ঠিক এক বছর আগে ভারতের এই সামরিক অভিযান স্থায়ী হয়েছিল আধ ঘণ্টারও কম সময়। কিন্তু এর রেশ এবং পরবর্তী সামরিক উত্তেজনা স্থায়ী হয়েছিল টানা ৮৮ ঘণ্টা। কারগিল যুদ্ধের পর ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে এটিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভারতীয় বায়ুসেনা আজ একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে সুনির্দিষ্ট নিশানায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসী পরিকাঠামো এবং সামরিক স্থাপনাগুলোকে মুহূর্তে অচল করে দেওয়া হয়েছিল। বায়ুসেনার টুইট এখন ভাইরাল: “অপারেশন সিঁদুর, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত। ভারত কিছুই ভোলে না—ভারত কিছুই ক্ষমা করে না।”
বিস্ফোরক বৃদ্ধি প্রতিরক্ষা বাজেটে
অপারেশন সিঁদুরের পরবর্তী এক বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের কেনাকাটায় নজিরবিহীন উল্লম্ফন দেখা গিয়েছে। ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ৬.৮১ লক্ষ কোটি টাকার সরঞ্জাম ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে, যা আগের বছরের ১.৭৬ লক্ষ কোটি টাকার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক ড্রোন ব্যবস্থা, দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম, স্টেলথ যুদ্ধজাহাজ এবং মহাকাশ-ভিত্তিক নজরদারি সরঞ্জাম। সরকারের জরুরি ক্রয়ের ক্ষমতার ফলে প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্র ফাস্ট-ট্র্যাক মোডে সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা আগের চেয়ে ৫০ শতাংশ দ্রুত গতিতে বাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে।
বদলে যাওয়া রণকৌশল: সেন্সর-টু-শুটার
অপারেশন সিঁদুর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী যে শিক্ষা নিয়েছে, তা হলো রিয়েল-টাইম সমন্বয়ের গুরুত্ব। বর্তমানে ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং নির্ভুল অস্ত্রের (Precision Weapons) ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনী এখন ‘সেন্সর-টু-শুটার টাইমলাইন’ কমানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত, অর্থাৎ শত্রুকে চিহ্নিত করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যেন তাকে ধ্বংস করা যায়। এই অভিযানে তিন বাহিনীর মধ্যে যে অভূতপূর্ব সমন্বয় দেখা গিয়েছিল, তা এখন ভারতীয় সামরিক ব্যবস্থার স্থায়ী মডেলে পরিণত হয়েছে।
মেক ইন ইন্ডিয়া ও প্রধানমন্ত্রীর সংকল্প
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আজ ফের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের জিরো টলারেন্স নীতি স্পষ্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন, “সন্ত্রাসবাদকে হারাতে এবং এর সহায়ক পরিবেশকে ধ্বংস করতে আমরা অটল।” উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এখন দেশীয় সংস্থাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত এক বছরে ভারত তার সামরিক শক্তিকে আরও বেশি দ্রুতগামী, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং দেশীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। অপারেশন সিঁদুর আজ আর কেবল একটি অভিযান নয়, এটি নতুন ভারতের এক অপরাজেয় সামরিক মডেল।





