এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ‘টেন্টেড’ বা ‘দাগী’ বলে চিহ্নিত অযোগ্যরা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন না। সোমবার এই নির্দেশ দিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দিল যে, নতুন করে শূন্যপদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতিগ্রস্তদের কোনও স্থান নেই। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেন, যা রাজ্যের শিক্ষা নিয়োগ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফেরানোর প্রক্রিয়ায় এক বড় ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি বাতিল হওয়া ২৬,০০০ চাকরির শূন্যপদে নতুন করে এসএসসি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। কমিশনের এই বিজ্ঞপ্তি ঘিরে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯টি মামলার শুনানি চলছে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে। আগেই কলকাতা হাইকোর্ট প্রশ্ন তুলেছিল, কেন নতুন বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত অযোগ্যদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে স্পষ্ট বারণ করা হয়নি।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ও রাজ্যের সওয়াল:
এদিন বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, “আদালত চাইছে, অযোগ্যদের পরীক্ষা থেকে বাদ দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলুক। সুপ্রিম কোর্টের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা হোক।”
বিচারপতির এই মন্তব্যের উত্তরে রাজ্যের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, “কতবার তাঁরা ফল ভুগবে, সাজা পাবে?” এর জবাবে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “তাঁরা প্রতারণা করে চাকরি পেয়েছে, তাই তাঁদের বাদ যেতেই হবে।”
‘দাগী অযোগ্য’ আবেদনপত্র বাতিল হবে:
কলকাতা হাইকোর্ট এদিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে যে, ‘দাগী অযোগ্য’ চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দিতে হবে। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের নির্দেশ অনুযায়ী, যদি কোনো ‘দাগী অযোগ্য’ প্রার্থী ইতিমধ্যেই নতুন নিয়োগের জন্য আবেদন করে থাকেন, তবে সেই আবেদনপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে। হাইকোর্ট আরও জানিয়েছে যে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। গত ৩০ মে এসএসসি যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল, তাকে সামনে রেখেই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া যাবে বলেও আদালত নির্দেশ দিয়েছে।
বিচারপতি জোর দিয়ে বলেন, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত অযোগ্যরা কোনোভাবেই অংশ নিতে পারবেন না। তাঁদের বাদ দিয়েই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সংগঠিত করতে হবে। এসএসসি এবং রাজ্যকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য ও কমিশনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন:
আদালতের এই কড়া অবস্থানের মুখে এদিনও রাজ্য সরকার এবং স্কুল সার্ভিস কমিশন নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত অযোগ্যদের পাশেই দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়াল করেন যে, সুপ্রিম কোর্ট কোথাও বলেনি যে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত অযোগ্যরা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে না। তাঁর যুক্তি ছিল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী তারা কেবল বয়সজনিত ছাড় পাবেন না, কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন না এমন কোনও নির্দেশ নেই।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়াল শুনে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “এতবড় দুর্নীতির অভিযোগ, টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলেছে সুপ্রিম কোর্ট, তারপরও এটা বলবেন?” জবাবে কমিশনের আইনজীবী বলেন, “তদন্ত শেষ হয়নি, কিছু প্রমাণ হয়েছে? কারও দোষ প্রমাণ হয়েছে? কোন আইনে এদের আটকানো হবে?” তিনি আরও বলেন, যদি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত অযোগ্যরা অংশ না নিতে পারেন, তাহলে ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া অসফল চাকরিপ্রার্থীরাও বাদ পড়ে যাবেন। এসএসসি দাবি করে, সুপ্রিম কোর্ট নির্দিষ্টভাবে অযোগ্য বলে চিহ্নিত না হওয়া ব্যক্তিদের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাকরি করার সুযোগ দিয়েছে, যার মানে এই নয় যে তাদের প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে, কলকাতা হাইকোর্ট এই সমস্ত যুক্তি খারিজ করে দিয়ে সাফ নির্দেশ দিয়েছে, এসএসসি-র নতুন বিজ্ঞপ্তি মেনে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলবে, কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে বা যাদের নাম চাকরি বাতিল হওয়া তালিকায় রয়েছে, তাদের আবেদনপত্র বাতিল করতে হবে। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশই চূড়ান্ত। সেই নির্দেশ মেনেই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে।” এই রায়ের ফলে অযোগ্যদের নতুন করে সরকারি চাকরিতে ঢোকার পথ বন্ধ হলো বলেই মনে করা হচ্ছে।