ভারত, যেখানে খেলাধুলা শুধু একটি বিনোদন নয়, বরং এক গভীর আবেগ। উত্তেজনা, আনন্দ, রোমাঞ্চ—সবকিছুই খেলাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। তবে কখনও কখনও এই আবেগই নিয়ে আসে ঘোর শোকের ছায়া। বুধবার বেঙ্গালুরুতে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (RCB)-এর আইপিএল জয়ের উল্লাস মুহূর্তে পরিণত হলো মৃত্যুমিছিলে, যা ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সের সেই ভয়াবহ দিনটিকে আবার মনে করিয়ে দিল।
১৯৮০-র ইডেন: এক ভয়ঙ্কর ফুটবলপ্রেমী দিবস
আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেন না, কিন্তু প্রবীণদের কাছে ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্টের দিনটি আজও এক বিভীষিকাময় স্মৃতি। সেদিন কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের এক হাই-ভোল্টেজ ফুটবল ম্যাচ চলছিল। প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের ভিড়ে ঠাসা গ্যালারিতে খেলা চলাকালীন মোহনবাগানের বিদেশ বসু ও ইস্টবেঙ্গলের দিলীপ পালিতের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হলে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। মুহূর্তেই সেই উত্তেজনার আঁচ গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ে, দর্শকরা একে অপরের দিকে পাথর ছুঁড়তে শুরু করেন। পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে পুলিশ যখন হিমশিম খাচ্ছিল, তখন শুরু হয় হুড়োহুড়ি। পদপিষ্ট হয়ে সেদিন ১৬টি তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। আজও এই দিনটি ‘ফুটবলপ্রেমী দিবস’ নামে পরিচিত হলেও, এটি মূলত শোক আর অপ্রস্তুত ব্যবস্থাপনার এক কালো অধ্যায় হিসেবে কলকাতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
২০২৫-এর বেঙ্গালুরু: ক্রিকেটের জয়োল্লাস ম্লান
দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে যখন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (RCB) প্রথমবারের মতো আইপিএল ট্রফি জিতলো, তখন পুরো বেঙ্গালুরু শহরজুড়ে এক বাঁধভাঙা উন্মাদনা। এমজি রোড, ব্রিগেড রোড, কাব্বন পার্ক এবং বিধান সৌধের আশপাশে লক্ষাধিক মানুষের ভিড় জমেছিল প্রিয় খেলোয়াড়, বিশেষ করে বিরাট কোহলিকে এক ঝলক দেখার জন্য। কিন্তু এই জয়োল্লাসই মাত্র ২৪ ঘণ্টার অপরিকল্পিত প্রস্তুতির কারণে পরিণত হলো মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে। এই অপ্রতিরোধ্য ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন অন্তত ১১ জন। এঁদের মধ্যে স্কুল পড়ুয়া, কলেজ ছাত্র এবং অফিসফেরত কর্মীরাও ছিলেন, যাঁরা হয়তো ভাবেননি এই আনন্দ তাঁদের জীবনে শেষ আনন্দ হবে।
একই ঘটনা, আলাদা শহর, একই প্রশ্ন
১৯৮০ সালের কলকাতা হোক বা ২০২৫ সালের বেঙ্গালুরু—উত্তেজনা, ভালোবাসা আর খেলাকে ঘিরে মানুষের আবেগ একই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই বাঁধভাঙা আবেগকে সামলাতে কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে আমাদের প্রশাসন? কেন শুধুমাত্র একটি খেলা ঘিরে উত্তেজনায় মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে?
বিশ্বজুড়ে খেলার মাঠে মৃত্যুর ঘটনা: এক অপ্রিয় বাস্তবতা
এমন ঘটনা যে শুধু ভারতেই ঘটে তা নয়, বিশ্বজুড়ে এর নজির রয়েছে। ১৯৮৯ সালের হিলসবরো দুর্ঘটনায় ৯৭ জন ফুটবলপ্রেমী প্রাণ হারিয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে পেরুর লিমায় এক ফুটবল ম্যাচ ঘিরে ৩০০-র বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। খেলার মাঠে শুধু বলই নয়, অনেক সময় মানুষের প্রাণও গড়ায়। বেঙ্গালুরুর এই দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, কেবল আবেগ দিয়ে বিশাল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। খেলার প্রতি ভালোবাসা যদি প্রশাসনের উদাসীনতার সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে এমন বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই ১১টি প্রাণ কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের এক মর্মান্তিক গল্প। এই ঘটনা আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে যে, খেলাধুলার আনন্দকে নিরাপদ রাখতে প্রশাসনকে আরও বেশি সচেতন ও প্রস্তুত থাকতে হবে।