এ যেন সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানানো এক বাস্তবের লড়াই। অভাবের তাড়নায় মা-বাবার থেকে দূরে থেকেও দমে যাননি পূর্ব বর্ধমানের কালনা মহারাজা হাই স্কুলের ছাত্র সাগর মণ্ডল। উচ্চমাধ্যমিকে ৪৮৮ নম্বর পেয়ে সারা রাজ্যে নবম স্থান অধিকার করে প্রমাণ করে দিলেন— ইচ্ছাশক্তি থাকলে দারিদ্র্য কখনোই সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না।
একাকী লড়াইয়ের দিনলিপি: সাগরের বাবা-মা শান্তিপুরের তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু শিল্পে মন্দা আসায় কাজ হারিয়ে তাঁরা গুজরাতে চলে যেতে বাধ্য হন। এরপর থেকে দীর্ঘ দু’বছর সাগরের জীবন একাই কেটেছে। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে কাপড় কাচা, বাজার করা—সবই নিজে হাতে সামলাতে হয়েছে তাকে। পাশাপাশি চলেছে পড়াশোনা। সাগর জানায়, “বাবা-মা সেখান থেকে যতটা পারতেন টাকা পাঠাতেন। সেই সামান্য অর্থেই কোনোমতে চলত সংসার।”
শিক্ষকদের ঋণ: সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের অবদানের কথা বারবার কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করেছেন সাগর। তিনি জানান, বহু শিক্ষক তার আর্থিক অবস্থার কথা জেনে মাইনে নিতে চাইতেন না। ২০০ টাকা মাইনে দিয়েও অনেকে তাকে পড়িয়েছেন। এমন শিক্ষকদের আশীর্বাদ ও সাহায্য ছাড়া এই সাফল্য পাওয়া অসম্ভব ছিল বলে মনে করে সে।
স্বপ্নপূরণে বাধা অভাব: আইএএস (IAS) হওয়ার স্বপ্ন দেখা সাগর এখন পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে চায়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচের চিন্তায় এখন থেকেই রাতের ঘুম উড়ছে তার। সাগর জানিয়েছে, মা-বাবার দৈনিক আয় ৪-৫০০ টাকা মাত্র। তার ওপর ভিনরাজ্যে ঘর ভাড়া দিয়ে তাঁদের নিজেদেরই থাকা-খাওয়ার লড়াই চলছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তা তার কাছে পৌঁছায়নি। ভবিষ্যতের পথ সুগম করতে সরকার ও সচেতন মহলের আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে এই মেধাবী ছাত্র।
সাফল্যের মন্ত্র: আগামী প্রজন্মের পরীক্ষার্থীদের জন্য সাগরের টিপস খুব স্পষ্ট:
প্রতিদিন নিয়মিত স্কুলে গিয়ে ক্লাস করতে হবে।
পাঠ্যবইয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
দু-তিনটি বই পড়ে নিজস্ব নোট তৈরি করতে হবে।
প্রশ্নের উত্তর হতে হবে সংক্ষিপ্ত, প্রাসঙ্গিক (To the point) এবং নির্ভুল।
সাগরের এই লড়াকু মানসিকতা আজ বহু পড়ুয়ার কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্পাদকীয় নোট: একজন মেধাবী অথচ অভাবী পড়ুয়ার এই লড়াকু জীবনকাহিনী পাঠকদের মনে এক গভীর দাগ কাটবে। সাগর মণ্ডলের ভবিষ্যৎ যেন উজ্জ্বল হয়, সেই কামনাই করি।





