রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) পরিশোধের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করার সময়সীমা ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ২৫ শতাংশ বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত, এবং তার আগে ১৫ জুনের মধ্যে রাজ্যকে সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা জমা দিতে হবে তাদের পদক্ষেপ সম্পর্কে। কিন্তু এই নির্ধারিত সময়সীমার ঠিক মুখে, রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে এক ‘সংশোধন আবেদন’ (Modification Application) নিয়ে, যা এই গোটা প্রক্রিয়াকে নতুন এক জটিলতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
নবান্নের যুক্তি: ‘মাপকাঠি অস্পষ্ট’
নবান্ন সূত্রের খবর, রাজ্যের এই আবেদনের মূল যুক্তি হলো, ডিএ নির্ধারণের মাপকাঠি কী, তা সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী রায়ে স্পষ্ট নয়। কোন ভিত্তিতে, নির্দিষ্ট কতদিনের ও কত টাকার বকেয়ার উপরে এই ২৫ শতাংশের হিসেব করা হবে, তা নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে এক সূক্ষ্ম আইনি চাল হিসেবে দেখছেন ওয়াকিবহাল মহল। সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে গরমের ছুটি চলছে এবং আদালত জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে খুলবে। ফলস্বরূপ, রাজ্যের এই আবেদন নিয়ে শুনানি হতে আরও সময় লাগবে।
আপাতত ‘একমাত্র পথ’ পরিশোধ?
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্টের এই ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত, আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশ মেনে সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মিটিয়ে দেওয়া ছাড়া রাজ্য সরকারের কাছে আপাতত অন্য কোনো পথ খোলা নেই। যদিও বকেয়া মেটানোর ব্যাপারে রাজ্য সরকার এখনো কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করেনি, তবে বিভিন্ন দপ্তর থেকে কত সংখ্যক সরকারি কর্মচারী এই বকেয়া পাওয়ার যোগ্য, তার একটি তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
নবান্নের কর্তারা অবশ্য মনে করছেন, এই ২৫ শতাংশ বকেয়া এখন মিটিয়ে দেওয়া হলেও, ভবিষ্যতে ‘সংশোধন আবেদন’-এর ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট যদি রাজ্যের ‘অনুকূলে’ কোনো নির্দেশ দেয়, তবে সেই মতো পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আইনজ্ঞদের একাংশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি সুপ্রিম কোর্ট বকেয়া ডিএ-র এই ২৫ শতাংশ অর্থ অথবা আগামী দিনে সম্পূর্ণ বকেয়া ডিএ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান নেয়, তবে রাজ্যের আর্থিক অবস্থার ওপর এতটা চাপ পড়বে না। সুপ্রিম কোর্টে ডিএ শুনানির সময় রাজ্যের কৌঁসুলিরা একাধিকবার রাজ্যের আর্থিক দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছিলেন। যদি ‘অনুকূলে’ রায় আসে, তবে এই ২৫ শতাংশ বাবদ দেওয়া টাকা ফেরত নেওয়ার সুযোগও থাকবে।
বকেয়া ‘মৌলিক অধিকার’, জানিয়েছে শীর্ষ আদালত
নবান্ন সূত্রের খবর, সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী রায় নিয়ে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তারা একাধিকবার বৈঠক করেছেন এবং সকলেই একমত হয়েছেন যে, ‘সংশোধন’ চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী রায়ের কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশদ ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে রায় কার্যকর করা সহজ হবে। তবে, ডিএ সংক্রান্ত মূল মামলাটি যেমন চলছে, তেমনই চলবে। শীর্ষ আদালতও পূর্ববর্তী শুনানিতে জানিয়ে দিয়েছে, ডিএ সরকারি কর্মচারীদের মৌলিক অধিকার কিনা, সেই ব্যাপারে তারা আগামী দিনে শুনানি করবেন। তবে তার আগে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ আটকে রাখা যায় না।
এদিকে, মামলাকারী সরকারি কর্মচারীদের দাবি, বুধবার পর্যন্ত রাজ্য সরকারের ‘সংশোধন আবেদন’-এর নথি তাদের হাতে পৌঁছয়নি। সেটি পেলে তারা পরবর্তী পদক্ষেপ করবেন। আইনজ্ঞদের বক্তব্য, মামলা সদ্য ফাইল হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট যতক্ষণ না এটি গ্রহণ করছে, ততক্ষণ মামলাকারীদের কাছে নোটিস বা মামলার নথি আসবে না।
উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় কারোল ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার ডিভিশন বেঞ্চ গত ১৬ মে অন্তর্বর্তী নির্দেশে জানিয়েছিল, কলকাতা হাইকোর্টের ২০২২ সালের রায় মেনে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ ছ’সপ্তাহের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে। পঞ্চম বেতন কমিশন ২০০৮ সালের ১ এপ্রিল চালু হলেও, এর রেট্রোস্পেক্টিভ এফেক্ট ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, অর্থাৎ দশ বছরের বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ দিতে বলা হয়েছে অন্তর্বর্তী রায়ে। মামলাকারী সরকারি কর্মচারীদের দাবি, রিভিশন অফ পে অ্যান্ড অ্যালাওয়েন্স (রোপা), ২০০৯ অনুযায়ী এই ডিএ দিতে হবে রাজ্য সরকারকে।
এই আইনি জটিলতা এবং রাজ্য সরকারের নতুন চাল, ডিএ বিতর্কের দীর্ঘমেয়াদী যাত্রাপথে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া প্রাপ্য কবে এবং কীভাবে মেটানো হবে, তা জানতে এখন সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছেন সকলে।





