কেন্দ্রের বাংলাদেশিদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তের উত্তাপের মধ্যেই বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের খবর নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। এই আবহে আগামী অগস্ট মাস থেকে পশ্চিমবঙ্গেও ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। এর ঠিক আগেই উত্তর ২৪ পরগনার বাগদায় নাগরিকত্ব (সংশোধিত) আইন, অর্থাৎ সিএএ-এর অধীনে আবেদনের জন্য মানুষের লম্বা লাইন দেখা গেছে, যা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র চাপানউতোর সৃষ্টি করেছে।
মতুয়া মন জয় ও রাজনৈতিক সমীকরণের জটিলতা:
দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস বরাবরই দাবি করে এসেছে যে, ভোটার কার্ড ও আধার কার্ড থাকার সুবাদে মতুয়ারা ভারতীয় নাগরিক। তারা সিএএ-এর কড়া বিরোধিতা করে রাজ্যজুড়ে আন্দোলনও চালিয়েছে। এর ঠিক বিপরীত মেরুতে, বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুরের উদ্যোগে গত কয়েক মাস ধরেই সিএএ-এর অধীনে আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু করার তৎপরতা দেখা গেছে। এই দুই দলের বিপরীতমুখী অবস্থান মতুয়া ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিজেপির উদ্যোগে শিবির, আবেদনকারীদের ভিড় ও প্রশ্নের মুখে কারণ:
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাগদা পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী দলনেতা সৌরভ গোয়ালির উদ্যোগে কানিয়ারা দুই গ্রাম পঞ্চায়েতের চুয়াটিয়া বাজারে বৃহস্পতিবার একটি বিশেষ শিবির খোলা হয়। এই শিবিরকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে আসা মানুষের চোখে পড়ার মতো ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এদিন প্রায় শতাধিক গ্রামবাসী নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন।
আবেদনকারীদের মধ্যে অন্যতম যুধিষ্ঠির মণ্ডল বলেন, “আমরা ১৯৯৩ সালে ভারতে এসেছিলাম। বাংলাদেশের প্রমাণপত্র এবং ভারতীয় প্রমাণপত্র নিয়ে আজ সিএএ-এর জন্য আবেদন করলাম।” হঠাৎ করে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভিড় কেন, এই প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। অনেকে এর পিছনে বিহারের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ প্রক্রিয়া এবং আগামী বছর রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের আসন্ন প্রক্রিয়াকে দায়ী করছেন। এই বিষয়গুলি মাথায় রেখেই সম্ভবত নতুন করে তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
বাগদা পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী দলনেতা সৌরভ গোয়ালি এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা বিশেষ শিবির করে সাধারণ মানুষকে সিএএ-এর জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। সিএএ এখন আইনে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই কারণে সাধারণ মানুষ আবেদন করছে। সকলকে আমরা সহযোগিতা করছি। আজ ৪০ থেকে ৫০ জন আবেদন করবেন।”
তৃণমূলের তীব্র অভিযোগ: ‘ভুয়ো শিবির’ ও বিভ্রান্তির রাজনীতি:
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, “বাগদাতে একজন পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী নেতা একটি ভুয়ো সিএএ শিবির পরিচালনা করছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের একমাত্র দায়িত্বে। তারাই এই কাজ করেন। তা হলে এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় বিজেপি নেতাদের কী ক্ষমতা আছে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি বিষয়টি স্পষ্ট করবে?”
তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, মানুষকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। বাগদা পশ্চিম ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সহ-সভাপতি নিউটন বালা বলেন, “প্রায় এক বছর সিএএ লাগু হয়েছে। সাধারণ মানুষের তেমন সাড়া পড়েনি। মানুষ বলেছে আমরা নিঃশর্ত নাগরিকত্ব চাই, শর্তসাপেক্ষে নাগরিকত্ব চাই না। কিছু কিছু বিজেপির নেতারা ছোট ছোট ক্যাম্প করে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে আবেদন করাচ্ছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশেই মানুষ থাকবে।”
সিএএ এবং নাগরিকত্ব ইস্যুতে এই নতুন করে শুরু হওয়া বিতর্ক এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তাপ বাড়বে, তা স্পষ্ট।
(বিঃদ্রঃ খবরে ব্যবহৃত ছবিটি অরিজিনাল নয়, ছবিটি প্রতীকী রূপে AI দিয়ে বানানো হয়েছে)