৪০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় অফিসে তাণ্ডব! কোটি টাকার মালামাল লুট করে চম্পট সন্ত্রাসীরা

ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও রূপনগর এলাকায় চাঁদাবাজি, দখল এবং ভাঙচুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে ‘আফসানা হাউজিং’ নামের একটি আবাসন কোম্পানির অফিসে সম্প্রতি একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালায়। কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রামদা ও লাঠিসোটা নিয়ে প্রায় তিরিশ জন যুবক অফিসে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং এসি, সোফাসেট, টিভি ও ক্যাশটাকাসহ প্রায় এক কোটি টাকার মূল্যবান মালামাল পিকআপ ভ্যানে করে লুট করে নিয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মো. নাসির জানান, ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল এবং সেই চাঁদা না দেওয়ামূলক আক্রোশ থেকেই এই বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। মালিক সজীব ব্যাপারী কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করলেও বর্তমানে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।
চাঁদাবাজির এই ভয়ঙ্কর চিত্র কেবল কেরানীগঞ্জেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজধানী ঢাকার মিরপুর রূপনগর আবাসিক এলাকাতেও এর ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। প্লট কিনে নিজেদের স্বপ্নীল বাড়ি বানাতে গিয়ে পদে পদে চাঁদাবাজদের খপ্পরে পড়ছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। রূপনগরে চার কাঠার প্লটে ভবন নির্মাণের জন্য পাইলিং শুরু করতেই স্থানীয় চাঁদাবাজরা ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় নির্মাণ শ্রমিকদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ডেফোডিল হোমস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, ১০ তলা ভবনের কাজ চলার সময় তাঁর কাছেও ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় এবং চারবার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় প্লট ও ফ্ল্যাট মালিক কল্যাণ সমিতি এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছে যে, ২৪-এর পটপরিবর্তনের পর থেকে এই চাঁদাবাজি ও জবরদখলের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে এবং রূপনগর থানায় বারবার অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর সহযোগিতা মিলছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধমূলক এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ ক্ষমতা পাওয়ার পর পূর্বের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির পথ বেছে নিচ্ছে। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল মিলছে না। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপরাধ করলে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকলে তার মাশুল শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দিতে হবে। সবমিলিয়ে, প্রকাশ্য দিবালোকে এই ধরনের নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।