বৃহস্পতিবার দুপুরে আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভ ভাই পটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের মাত্র ৩২ সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙে পড়ল এয়ার ইন্ডিয়ার ১৭১ বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমান। দুপুর ১টা ৩৪ মিনিট নাগাদ টেক অফের পর মাত্র ৬০০ ফুট উচ্চতাতেই বিমানটি ‘লিফট’ হারিয়ে সোজা একটি বাড়ির উপর আছড়ে পড়ে, যার ফলস্বরূপ ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত না হলেও, বিমানের ধ্বংসাবশেষ এবং আগুনের তীব্রতা দেখে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে একাধিক তত্ত্ব উঠে আসছে, যা ঘিরে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।
জোড়া ইঞ্জিন বিকল? র্যাম এয়ার টার্বাইন ঘিরে রহস্য
প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, বিমানের জোড়া ইঞ্জিনই বিকল হয়ে গিয়েছিল। এই আশঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলিতে, যেখানে দুর্ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্তে বিমানের র্যাম এয়ার টার্বাইন (RAT) চালু হতে দেখা গেছে। সাধারণত, বিমানের দুটি ইঞ্জিনই বিকল হয়ে গেলে এই বিকল্প ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়, যা বিমানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। প্রশ্ন উঠছে, যদি RAT চালু হয়েও থাকে, তবে কেন বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারাল এবং ভেঙে পড়ল? বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ করছেন, ইঞ্জিনের ত্রুটির পাশাপাশি বিমানের মূল পাওয়ার সিস্টেমও অকেজো হয়ে গিয়েছিল, যা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে। বোয়িং ৭৮৭ এর ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেমও তাই বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জোড়া ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পেছনের কারণ নিয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। এটি কি কেবলই একটি যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল? নাকি টেক অফের সময় কোনো পাখির সঙ্গে ধাক্কা লাগার ফলেই এমনটা ঘটল? মাত্র ৬২৫ ফুট উচ্চতায় পৌঁছানোর পরই কেন বিমানটি ভেঙে পড়ল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিমানের ‘ব্ল্যাক বক্স’ উদ্ধার হলে দুর্ঘটনার আসল কারণ সম্পর্কে আলোকপাত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উচ্চ তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত ওজন: লিফট হারানোর কারণ?
অন্যদিকে, টেক অফের পর বিমানটি কেন পর্যাপ্ত ‘লিফট’ পেল না, তা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, আহমেদাবাদের তীব্র গরম এবং বিমানের অতিরিক্ত ওজন কি এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী? বৃহস্পতিবার আহমেদাবাদের তাপমাত্রা ছিল ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তাপমাত্রা বাড়লে বাতাস পাতলা হয়ে যায়। পাতলা বাতাসে একটি ভারী বিমান উড়ানো অত্যন্ত কঠিন কাজ এবং এর জন্য বেশি ‘ধাক্কা’ বা থ্রাস্টের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত ‘ধাক্কা’র অভাবেই কি বিমানটি উড়তে পারল না?
এই প্রসঙ্গে আরও একটি জরুরি প্রশ্ন উঠে আসছে – বিমানবন্দরের কাছে নগরায়ন কি ‘গরম’ বাড়িয়ে দিচ্ছে? ঘন জনবসতি এবং কংক্রিটের কাঠামো বিমানবন্দরের আশেপাশের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে কিনা, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। আহমেদাবাদের এই বিমান দুর্ঘটনা বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকার নগরায়ন এবং তার পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তার অবকাশ তৈরি করেছে।
তদন্ত যত এগোবে, এই দুর্ঘটনার পেছনের আসল কারণ ততই স্পষ্ট হবে। তবে আপাতত, ৩২ সেকেন্ডের এই ভয়াবহ বিপর্যয়কে ঘিরে দানা বাঁধছে অসংখ্য প্রশ্ন আর উদ্বেগ। এই মর্মান্তিক ঘটনা বিমান সুরক্ষার প্রোটোকল এবং বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকার পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করছে।