২৬-এর শেষেই ভয়ংকর প্রাকৃতিক তাণ্ডব! এল নিনোর মাঝেই ইসরোর চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাসে বাড়ছে উদ্বেগ!

২০২৬ সালের প্রকৃতি কি তবে আরও বড় কোনো তাণ্ডবের প্রস্তুতি নিচ্ছে? একদিকে এল নিনোর ভ্রুকুটি এবং বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ওপর তার মারাত্মক বিরূপ প্রভাব, অন্যদিকে খোদ ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ISRO) নতুন গবেষণা ঘিরে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ISRO-র অধীন স্পেস অ্যাপ্লিকেশনস সেন্টারের (SAC) সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষের তিন মাসে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি হতে চলেছে একের পর এক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়।

অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উত্তর ভারত মহাসাগরে প্রায় তিনটি মারাত্মক ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় বা ট্রপিক্যাল সাইক্লোন তৈরি হতে পারে। ISRO-র Meteorological & Oceanographic Satellite Data Archival Centre (MOSDAC)-এর প্রকাশিত এক গ্রাফে এমনই আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এই সম্ভাব্য তিনটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্মিলিত ধ্বংসক্ষমতা বা শক্তি প্রায় ১৩.০৬ গুণ দশের পাওয়ায় ছয় নটস কিউব পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। গত ৮ সেপ্টেম্বর MOSDAC-এর ওয়েবসাইটে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এই পূর্বাভাস যদি শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়, তবে এই আসন্ন তিনটি ঝড়ের মোট শক্তি বিগত ৪৪টি পৃথক ঘূর্ণিঝড়ের শক্তির তুলনায় প্রায় ৮৩ শতাংশ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে এই ঝড়গুলি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে চলেছে এবং এর ধ্বংসলীলাও হতে পারে নজিরবিহীন।

অবশ্য আবহাওয়াবিদরা পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, এই গবেষণালব্ধ পূর্বাভাসকে কোনো নির্দিষ্ট বা আসন্ন একক ঘূর্ণিঝড়ের সুনির্দিষ্ট আগাম সতর্কতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। MOSDAC-এর তথ্য পদ্ধতি অনুযায়ী, উত্তর ভারত মহাসাগরে আগামী মৌসুমে ঘূর্ণিঝড়ের সামগ্রিক কার্যকলাপ অনুমান করার জন্য মূলত দীর্ঘমেয়াদী বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি এবং মহাসাগরীয় তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গত কয়েক দশকের জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়াসংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্য ব্যবহার করে এই বিশেষ মডেল তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ঝড়ের সম্ভাব্য সংখ্যা এবং তীব্রতা অনুমান করা সম্ভব হয়েছে।

ISRO-র এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা আগামী দিনে দেশের দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী ও পরিকল্পনা বিভাগকে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে বড় ভূমিকা পালন করবে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশেষ করে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের এই দীর্ঘ সময়সীমায় আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত নজরদারি বজায় রাখতে হবে। উল্লেখ্য, বছরের এই সময়টিতে বঙ্গোপসাগর বরাবরই ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। তবে সেপ্টেম্বর মাসের এই দীর্ঘমেয়াদী মৌসুমি পূর্বাভাস থেকে কোনো নির্দিষ্ট ঘূর্ণিঝড় ঠিক কোথায় জন্ম নেবে, তার সঠিক গতিপথ কোন দিকে হবে কিংবা ভারতের কোন উপকূলে তা আছড়ে পড়বে, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও, বছরের শেষ প্রান্তিকে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের জলভাগের প্রতিটি গতিপ্রকৃতির ওপর কড়া নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি।

শুধু ভারত মহাসাগরীয় জলভাগই নয়, আবহবিদদের মতে এই সময় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। কারণ ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ট্রপিক্যাল ডিস্টার্ব্যান্স বা টাইফুনের অবশিষ্টাংশ সিস্টেম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশের ওপর দিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে অনেক সময় আন্দামান সাগর পর্যন্ত এসে পৌঁছাতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দক্ষিণ চিন সাগর বা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি টাইফুনই সোজা ভারতীয় উপকূলের দিকে ধেয়ে আসবে। যেকোনো সামুদ্রিক ঝড়ের গতিপথ মূলত সেই মুহূর্তের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। ফলস্বরূপ, ২০২৬ সালের বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের পাশাপাশি আন্দামান সাগর, দক্ষিণ চিন সাগর এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের সমস্ত ট্রপিক্যাল সিস্টেমগুলির গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানীদের মতে, শুধুমাত্র বাতাসের তীব্র গতিবেগ দিয়েই কোনো ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ঝড়ের ধ্বংসলীলার পেছনে প্রবল অতিবৃষ্টি এবং তার জেরে সৃষ্টি হওয়া জলোচ্ছ্বাসও অত্যন্ত বড় ভূমিকা পালন করে। অতীতে আম্পান কিংবা ইয়াসের মতো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়গুলির ক্ষেত্রেও এই একই ভয়ংকর রূপ প্রত্যক্ষ করেছিল ভারতবাসী। তাই আগাম সতর্কতা এবং সঠিক পরিকাঠামোগত প্রস্তুতিই এই সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার একমাত্র চাবিকাঠি।