১৫ লাখ টাকা না দেওয়ায় গাছ কাটা, জলের লাইন কাটা! সুশান্ত ঘোষের কুকীর্তি ফাঁস হতেই পুলিশি অ্যাকশন

কলকাতা পুরসভার ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষকে গ্রেফতার করল কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। দীর্ঘদিনের ফেরার থাকার পর ওড়িশার পুরী থেকে তাঁকে পাকড়াও করেন তদন্তকারীরা। তোলাবাজি, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, প্রতারণা এবং জালিয়াতির মতো একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে। এই গ্রেফতারির ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে প্রবল চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
তদন্তকারীদের সূত্রে খবর, সুশান্ত ঘোষের বিরুদ্ধে আনন্দপুর থানায় তোলাবাজির অভিযোগ দায়ের করেন এক ব্যবসায়ী। ওই এফআইআর-এ নাম ছিল আনন্দপুরের তৎকালীন যুব তৃণমূল সভাপতি সুজিত কুমার ওরফে বচ্চনেরও, যিনি সুশান্তের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। গত ১০ জুন বিমানবন্দর থেকে সুজিতকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর অভিযোগ, “সুশান্ত ঘোষ আমার কাছে ১৫ লক্ষ টাকা দাবি করেছিল। আমি সেই টাকা দিতে অস্বীকার করায় তারা আমার বাড়ির জলের লাইন কেটে দেয়। এমনকি দু’মাস পর আমার বাড়ির ১৪টি গাছও কেটে ফেলা হয়। তারা ভেবেছিল এই অত্যাচার করলে ভয়ে আমি টাকা দিয়ে দেব।”
পুলিশি জেরায় উঠে এসেছে, সুশান্ত ঘোষের বেআইনি আর্থিক লেনদেনের মূল দায়িত্ব সামলাতেন সুজিত ওরফে বচ্চন। তোলাবাজির টাকা কোথায় কীভাবে জমা হতো, তার পুরো হিসেব থাকত তাঁর কাছেই। এরপরই এই হাইপ্রোফাইল মামলার তদন্তভার তুলে দেওয়া হয় লালবাজারের প্রতারণা দমন শাখার হাতে।
তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে সুশান্ত ঘোষের কুকীর্তির ভয়াবহ সব তথ্য। ‘ইস্ট কলকাতা বিউটিফিকেশন’ বা ‘পূর্ব কলকাতা সৌন্দর্যায়ন’ প্রকল্পের নাম করে তিনি ব্যাপক তোলাবাজি চালাতেন। অথচ সরকারি নথিতে এই ধরনের কোনো প্রকল্পের অস্তিত্বই খুঁজে পাননি গোয়েন্দারা। অভিযোগ, রুবি হাসপাতালের পাশের রাস্তায় এই ভুয়া প্রকল্পের নাম করে ৯০০টি স্টল তৈরি করা হয়েছিল। স্টলের আকার অনুযায়ী নির্ধারণ করা হতো তোলাবাজির অংক। শুধু তাই নয়, দোকানগুলি একরকম দেখতে হবে—এই দোহাই দিয়ে নিজের ঘনিষ্ঠ লোকেদের বরাত পাইয়ে দিতেন সুশান্ত। স্টল মালিকদের অভিযোগ, নির্মাণের খরচ বাবদ তাদের কাছ থেকে কয়েকগুণ বেশি টাকা লুটে নিয়েছেন তিনি।
সুশান্ত ঘোষের এই গ্রেফতারি প্রসঙ্গে রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, “এসবই একই ধরণের ঘটনা। এরা প্রতিদিন সকালে এলাকার মানুষকে ফোন করে শাসাতো, টাকা চাইতো। এতদিন ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি। এখন মানুষ প্রশাসনের ওপর ভরসা পাচ্ছেন, তাই অভিযোগ জমা পড়ছে। এরা অন্যের ফ্ল্যাট, জমি থেকে শুরু করে ক্লাব এবং ভেরী পর্যন্ত দখল করে নিয়েছে। এতদিন এগুলো আড়ালে ছিল, এখন সব সামনে আসছে।”
কলকাতা পুলিশের দাবি, ধৃতকে জেরা করে এই তোলাবাজির জাল কত দূর বিস্তৃত এবং এর নেপথ্যে আরও কারা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরী থেকে গ্রেফতারের পর সুশান্তকে ট্রানজিট রিমান্ডে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এই ঘটনায় আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম জড়াতে পারে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।