১৩৫ বছরের পুরনো নিয়মে ইতি! দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় এল ঐতিহাসিক বিল, জানুন কী পরিবর্তন হচ্ছে!

ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা প্রথাগত কাগজের খতিয়ান বা লেজার বুক থেকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল রেকর্ডের যুগে প্রবেশ করলেও, এতদিন পর্যন্ত ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত নথিপত্র পরিচালনার মূল আইনটি পরিচালিত হচ্ছিল ব্রিটিশ আমলের ১৮৯১ সালের একটি পুরোনো কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। তবে দেশের আর্থিক খাতের আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে সেই দীর্ঘদিনের পুরনো ব্যবস্থায় এবার এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৫ আগস্ট লোকসভায় অনুমোদনের পর এবার ১০ আগস্ট রাজ্যসভাতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্যাঙ্কার্স বুকস এভিডেন্স বিল, ২০২৬’ পাশ হয়ে গেল। প্রস্তাবিত এই নতুন আইনটি ১৩৫ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ‘ব্যাঙ্কার্স বুকস এভিডেন্স অ্যাক্ট’-এর সম্পূর্ণ স্থলাভিষিক্ত হবে এবং এর আওতায় আধুনিক যুগের সমস্ত ডিজিটাল ও ক্লাউড-ভিত্তিক ব্যাঙ্কিং রেকর্ডগুলোকেও আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন এই বিল প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে, বিগত কয়েক বছরে দেশের আর্থিক খাতে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছে। ঐতিহ্যবাহী ব্যাঙ্কের পাশাপাশি নন-ব্যাংকিং ফিনান্সিয়াল কোম্পানি (এনবিএফসি), ফিনটেক সংস্থা, পেমেন্ট এগ্রিগেটর এবং নানা ধরনের আধুনিক আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারীর ব্যাপক উত্থানের ফলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার চিত্রটাই বদলে গেছে। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্যই এই নতুন আইন আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল।

নতুন আইনের আওতায় যে সমস্ত প্রধান পরিবর্তন আসতে চলেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:

১. ব্যাঙ্কের ডিজিটাল নথিপত্র সরাসরি সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে
সবচেয়ে বড় এবং যুগান্তকারী পরিবর্তনটি হলো ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল নথিপত্রকে এখন থেকে সরকারিভাবে ‘ব্যাঙ্কার্স বুক’ বা ব্যাঙ্কের আনুষ্ঠানিক নথিপত্র হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া। ১৮৯১ সালের আদি আইনটি এমন এক সময়ে তৈরি করা হয়েছিল যখন ব্যাঙ্কগুলো মূলত কাগজ-কলমের হিসাব, খতিয়ান এবং অন্যান্য ভৌত নথিপত্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করত। যদিও সেই পুরনো আইনে মাইক্রোফিল্ম ও ম্যাগনেটিক টেপের মতো কিছু প্রাথমিক প্রযুক্তির উল্লেখ ছিল, তবে বর্তমান যুগের ডিজিটাল অগ্রগতির সঙ্গে তা একেবারেই বেমানান ছিল। নতুন বিলটিতে অত্যন্ত ব্যাপক ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাঙ্কগুলির নিজস্ব প্রাঙ্গণ কিংবা কোনো অফ-সাইট, ভার্চুয়াল বা ক্লাউড-ভিত্তিক সার্ভারে ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল আকারে সংরক্ষিত সমস্ত তথ্য আইনগতভাবে বৈধ বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ, আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে ব্যাঙ্ক হিসাব ও লেনদেন-সংক্রান্ত ডিজিটাল নথিপত্র এখন থেকে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করা যাবে, যা বর্তমানের ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং ও মোবাইল অ্যাপের যুগে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ।

২. ব্যাঙ্ক কর্মকর্তাদের বারবার আদালতে হাজিরা দেওয়ার ঝক্কি কমবে
এই বিলে সাধারণ ব্যাঙ্ক কর্মীদের হয়রানি থেকে বাঁচাতে একটি বিশেষ ও অত্যন্ত সুরক্ষিত আইনি বিধান রাখা হয়েছে। কোনো আইনি মামলায় যদি সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক সরাসরি পক্ষভুক্ত না থাকে, তবে সাধারণত ব্যাংকের নথিপত্র (ব্যাঙ্কার্স বুকস) উপস্থাপন করার জন্য বা শুধুমাত্র সেই নথিতে লিপিবদ্ধ লেনদেন প্রমাণ করার জন্য ব্যাংকের সাধারণ কর্মচারীদের বারবার আদালতে হাজির হতে বাধ্য করা যায় না। তবে বিশেষ কিছু জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন নথির নির্ভুলতা নিয়ে কোনো গুরুতর প্রশ্ন উঠলে কিংবা আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হলে আদালত নথিপত্র তলব করতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অযথা হয়রানি বন্ধ করা এবং ব্যাঙ্ক কর্মীদের বারবার আদালতে হাজিরা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে তাঁদের কর্মক্ষমতা বজায় রাখা।

৩. আইনের আওতাভুক্ত হতে পারে আরও অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান
এই নতুন আইনের আরেকটি অন্যতম বড় দিক হলো, কেন্দ্রীয় সরকারকে আর্থিক খাতের অন্যান্য উদীয়মান প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই আইন প্রয়োগ করার বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে এনবিএফসি, বড় বিমা কোম্পানি, পেনশন তহবিল এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই কঠোর আইনি কাঠামোর আওতাভুক্ত হতে পারবে। বর্তমান সময়ে মানুষ সঞ্চয়, বিনিয়োগ, বিমা এবং অর্থ লেনদেনের জন্য বহুমুখী পরিষেবা ব্যবহার করছে, ফলে আর্থিক খাতগুলো এখন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। সরকারের এই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের ফলে পুরো আর্থিক খাতের নিয়মে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

সবমিলিয়ে, প্রস্তাবিত এই আইনটি কেবল ব্যাঙ্কের নথিপত্রের সংজ্ঞাগত পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ১৩৫ বছরের পুরোনো একটি ধূলিসূত্র আইনকে আজকের একশো ভাগ ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার উপযোগী করে তোলার এক দূরদর্শী প্রয়াস।