১২ বছরে কর্পোরেটদের প্রায় ১০ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ! সংসদে বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস হতেই চাঞ্চল্য

ভারতীয় ব্যাংকিং খাত থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে এসেছে। সংসদে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, গত ১২টি অর্থবর্ষে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি বড় বড় কর্পোরেশনকে দেওয়া প্রায় ৯,৯৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ (NPAs) মওকুফ বা অবলোপন (Write-off) করেছে। বিশাল অঙ্কের এই ঋণ মওকুফের তথ্য সামনে আসতেই দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে।
সংসদে কী জানিয়েছে কেন্দ্র?
সংসদে এক লিখিত উত্তরে অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানিয়েছেন যে, গত ১২ বছরে ব্যাংকগুলি শিল্প ও পরিষেবা খাতের এই বিপুল পরিমাণ ঋণ মওকুফ করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মওকুফের পরিমাণ ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে সর্বোচ্চ ১,৪৮,৭৫৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা পরবর্তীতে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ২০,৪৮৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। পাশাপাশি, বৃহৎ শিল্প এবং পরিষেবা খাতে বকেয়া ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের ৬৩,১৯,০৫৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৬৯,২১,৭৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
‘রাইট-অফ’ বা ঋণ মওকুফ আসলে কী?
সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই ঋণ মওকুফ বা রাইট-অফ হলো মূলত একটি হিসাবরক্ষণ বা অ্যাকাউন্টিং প্রক্রিয়া, যা কোনোভাবেই ঋণগ্রহীতাকে আইনি দায়মুক্তি দেয় না।
রিজার্ভ ব্যাংকের (RBI) নির্দেশিকা অনুযায়ী, ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট বা হিসাবের খাতা পরিষ্কার করার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এর অর্থ এই নয় যে শিল্পপতিদের বকেয়া টাকা চিরতরে মাফ করে দেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতারা এখনও ওই ঋণ পরিশোধ করতে আইনিভাবে বাধ্য থাকেন এবং ব্যাংকগুলি বকেয়া অর্থ আদায়ের জন্য তাদের আইনি প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
অর্থনীতি ও অন্যান্য খাতের চিত্র
ঋণ মওকুফের এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার দেশের অর্থনীতির অন্যান্য ইতিবাচক সূচকগুলিও তুলে ধরেছে:
রাজস্ব ঘাটতি ও দেনা: ২০২০-২১ সালের জিডিপির ৯.২% থেকে কমে ২০২৫-২৬ সালে রাজস্ব ঘাটতি ৪.৪%-এ নেমে এসেছে। মোট বকেয়া দেনাও জিডিপির ৬১.৫% থেকে কমে ৫৮.২%-এ দাঁড়িয়েছে।
মূলধনী ব্যয়: মূলধনী ব্যয় ২০২০-২১ সালের ৪.৩ লক্ষ কোটি টাকা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ সালে ১০.৭ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্ব: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খুচরা মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল মাত্র ২.১%, যা ২০১৪-১৫ সালের পর সর্বনিম্ন। এছাড়া শ্রমশক্তি সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০১৭-১৮ সালের ৬% থেকে কমে ২০২৫ সালে ৩.১%-এ নেমে এসেছে।
বিদেশি ঋণ: ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষে ভারতের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৬২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সম্পূর্ণ টেকসই ও বিচক্ষণতার সঙ্গেই পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিপুল পরিমাণ কর্পোরেট ঋণ অবলোপনের এই পরিসংখ্যান একদিকে যেমন ব্যাংক ব্যবস্থার স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, অন্যদিকে সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সাফল্যের দাবিকেও সমানভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।