সোমবার অসম বিধানসভায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। ‘দ্য ইউনিফর্ম সিভিল কোড, অসম বিল, ২০২৬’ উত্থাপনের মাধ্যমে রাজ্যটি ব্যক্তিগত আইনের আধুনিকীকরণের পথে এক বড় মাইলফলক স্পর্শ করল। এই বিলটি বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং দত্তক গ্রহণের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই সাহসী পদক্ষেপ দেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বহুবিবাহের (পলিগ্যামি) ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা এবং লিভ-ইন সম্পর্কের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, অসমের এই পদক্ষেপ বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলার রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে যে, অসমের আদলে বাংলাতেও কি তবে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বাস্তবায়িত হতে চলেছে? উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এর আগে একাধিকবার বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলেছিলেন। ফলে অসমের এই মডেল এখন বাংলার রাজনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার অসমের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী অতুল বোরা বিধানসভায় বিলটি পেশ করেন। বিলের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, বহুবিবাহের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো ব্যক্তি প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকাকালীন দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিবাহের ন্যূনতম বয়স পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ এবং নারীর ক্ষেত্রে ১৮ বছর অটল রাখা হয়েছে। এছাড়া, কন্যাসন্তানদের সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সমাজ পরিবর্তনের পথে একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে লিভ-ইন সম্পর্কের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন সংক্রান্ত ধারাটি। বিলে বলা হয়েছে, লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা দম্পতিদের অবশ্যই ৬০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে নিজেদের সম্পর্ক নথিভুক্ত করতে হবে। যারা এই নিয়ম মানবেন না, তাদের জরিমানা এমনকি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। সরকারের সাফ বক্তব্য, এই নিয়ম নারীদের আইনি সুরক্ষা প্রদান করবে এবং সামাজিক শোষণ রোধে সহায়তা করবে।
তবে এই বিলে কিছু নির্দিষ্ট ছাড়ও রাখা হয়েছে। উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের মতোই অসমে তফসিলি উপজাতি (এসটি) সম্প্রদায় এবং ষষ্ঠ তফসিলের আওতাধীন এলাকাগুলোকে এই আইনের বাইরে রাখা হয়েছে। ধর্মীয় রীতিনীতি বা আচার-অনুষ্ঠানের ওপর কোনো আঘাত আসবে না বলেও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা স্পষ্ট করেছেন যে, এই বিল নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং সমাজে বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে আনা হয়েছে। অসমের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আনে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।





