হাতে করে ময়লা পরিষ্কারে মৃত্যু রোধে ফের কঠোর সুপ্রিম কোর্ট! উত্তর প্রদেশ সহ ১৫ রাজ্যের মুখ্য সচিবকে আদালত অবমাননার নোটিশ

নর্দমা ও সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের নামে মানব বর্জ্য বা ময়লা হাতে পরিষ্কার করার অমানবিক প্রথা এবং তার জেরে ঘটে চলা লাগাতার মৃত্যুর ঘটনায় ফের অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আদালতের কড়া নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পয়োঃপ্রণালী বা সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। আর এই অবহেলার জেরে উত্তর প্রদেশসহ দেশের মোট ১৫টি রাজ্যের মুখ্য সচিবদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিশ (Contempt of Notice) জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছে যে, কেন তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা শুরু করা হবে না?
আদালতের কঠোর পদক্ষেপ ও পূর্ববর্তী নির্দেশ:
প্রসঙ্গত, এর আগে ২০২৩ সালের ২০শে অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার, দেশের সমস্ত রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় সংস্থগুলিকে কড়া নির্দেশ দিয়েছিল যে, হাতে করে নর্দমা ও সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করার কাজ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ও বন্ধ করতে হবে। আদালতের নির্দেশ ছিল, এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না যেখানে নর্দমা বা সেপটিক ট্যাঙ্কে মানুষের নামার বা প্রবেশের প্রয়োজন পড়ে। পরিবর্তে নর্দমা পরিষ্কারের জন্য আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার, কঠোর নিরাপত্তা সরঞ্জাম (Safety Equipments) নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য ক্ষতিপূরণ ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত।
তথ্য ও পরিসংখ্যান—গত তিন বছরে মৃত্যুর খতিয়ান:
আদালতে পেশ করা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শুধুমাত্র নর্দমা ও সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে আনুমানিক প্রায় ১০০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সংসদে খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ১৫টি রাজ্যে সেপটিক ট্যাঙ্ক ও নর্দমায় নেমে কাজ করার সময় মোট ১৬৫ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে—
২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছিল ৬৫ জনের,
২০২৪ সালে মৃত্যু হয়েছিল ৫৪ জনের, এবং
২০২৫ সালে এখনও পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
কোন কোন রাজ্যের মুখ্য সচিবদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে?
আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের অমানবিক মৃত্যু অব্যাহত থাকায় গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিচারপতি অরবিন্দ কুমার এবং বিচারপতি বিপুল এম. পাঞ্চোলির বেঞ্চ। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে এবার দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহিতা নির্ধারণ করার সময় এসে গেছে। যে ১৫টি রাজ্যের মুখ্য সচিবদের এই আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠানো হয়েছে, সেগুলি হলো—
দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ, তেলেঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট, গোয়া, বিহার এবং ঝাড়খণ্ড।
আদালত অবমাননা (Contempt of Court) আসলে কী এবং এর শাস্তি?
আদালত অবমাননা বলতে মূলত আদালতের কোনো আদেশ, নির্দেশ, সিদ্ধান্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘন অথবা এমন কোনো কাজ করাকে বোঝায় যা বিচার প্রশাসনে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে।
সাংবিধানিক ক্ষমতা: ভারতীয় সংবিধানের ১২৯ নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট এবং ২১৫ নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে হাইকোর্টের আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করার ক্ষমতা রয়েছে।
আইনি বিধি ও শাস্তি: ১৯৭১ সালের আদালত অবমাননা আইনের ১২ নং ধারা অনুযায়ী, এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৬ মাসের সাধারণ কারাদণ্ড এবং ২,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই একসঙ্গে দেওয়া হতে পারে।
আদালত অবমাননা প্রধানত দুই প্রকারের হয়:
১. দেওয়ানি অবমাননা (Civil Contempt): কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতের কোনো আদেশ বা নির্দেশ অমান্য করলে তাকে দেওয়ানি অবমাননা বলা হয়।
২. ফৌজদারি আদালত অবমাননা (Criminal Contempt): যখন কোনো ব্যক্তি আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃত বাধা সৃষ্টি করেন, অথবা বিচার প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তখন তা ফৌজদারি অবমাননা হিসেবে গণ্য হয়।
কেন শুধু রাজ্যগুলির মুখ্য সচিবদেরই নোটিশ পাঠানো হলো?
সেপটিক ট্যাঙ্কের কারণে ঘটে চলা মর্মান্তিক মৃত্যু এবং আদালতের স্পষ্ট আদেশ অমান্য করার অভিযোগে রাজ্য সরকারের মুখ্য সচিবকে নোটিশ পাঠানোর মূল কারণ হলো—তিনিই হলেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। যখন সুপ্রিম কোর্ট কোনো রাজ্য সরকারকে আইনগত আদেশ দেয় এবং তা সঠিকভাবে পালিত হয় না, তখন প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মুখ্য সচিবকেই তলব করা হয়। আদালতের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য কোনো সরকারি প্রশাসনকে সরাসরি শাস্তি দেওয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের এই বেআইনি প্রথা বন্ধ করে আদালতের নির্দেশ কঠোরভাবে পালন নিশ্চিত করা।
শীর্ষ আদালতের এই ঐতিহাসিক ও কঠোর অবস্থানের পর এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির প্রশাসন এই প্রাণঘাতী প্রথা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।