এসকেলেটরের দু’পাশের এই কালো ব্রাশ কি জুতো পরিষ্কারের জন্য? আসল সত্যিটা জানলে চমকে যাবেন!

শপিং মল, মেট্রো স্টেশন, বিমানবন্দর কিংবা আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স—আজকাল প্রায় সব জনবহুল জায়গাতেই এসকেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ির (Escalator) ব্যবহার অত্যন্ত সাধারণ এক দৃশ্য। পা দিয়ে হেঁটে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার কোনো ঝক্কি নেই, সুনির্দিষ্ট ধাপে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেই পৌঁছে যাওয়া যায় গন্তব্যে। কিন্তু যাতায়াতের সময় চলন্ত সিঁড়ির দুই পাশের খাঁজে লাগানো লম্বা লম্বা কালো রঙের ব্রাশগুলো কি কখনও আপনার নজরে পড়েছে?

অধিকাংশ মানুষই হয়তো না জেনে মনে করেন যে, এই ব্রাশগুলো বুঝি জুতো পরিষ্কার করার জন্য দেওয়া হয়েছে! সেই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই অনেকেই বেশ যত্ন করে এসকেলেটরে ওঠার সময় সেখানে জুতো ঘষতেও শুরু করেন। কিন্তু আসল এবং চমকপ্রদ সত্যিটা হলো—জুতো পরিষ্কার করার সঙ্গে এই কালো ব্রাশের দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো সম্পর্ক নেই! জানলে অবাক হবেন, এসকেলেটরের এই ছোট্ট কালো ব্রাশটি আদতে আপনাকে বড় কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনার হাত থেকেই রক্ষা করে।

চলন্ত সিঁড়িতে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য বিপদ:
চলন্ত সিঁড়ি যখন ওপরে ওঠে বা নিচে নামে, তখন সিঁড়ির চলমান ধাপ এবং দু’পাশের স্থির দেওয়ালের ঠিক সংযোগস্থলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ছোট একটি ফাঁকা জায়গা বা গ্যাপ তৈরি হয়। বাইরে থেকে খালি চোখে এই ফাঁকটা খুব সামান্য বলে মনে হলেও, আসল ও ভয়াবহ বিপদ লুকিয়ে থাকে ঠিক সেখানেই। একটু ঢিলেঢালা জামাকাপড়, শাড়ি বা ওড়নার ঝুলন্ত অংশ, জুতোর ফিতে, কিংবা ছোট শিশুদের নরম চটি খুব সহজেই ওই লুকানো ফাঁকের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। আর একবার কোনো কিছু সেখানে আটকে গেলে চলন্ত সিঁড়ির শক্তিশালী মোটর ও মেশিন সেটাকে অন্ধের মতো ভেতরে টেনে নিতে শুরু করে, যার জেরে ঘটে যেতে পারে অঙ্গহানি বা প্রাণহানির মতো বড়সড় দুর্ঘটনা।

কালো ব্রাশ কীভাবে এই মারাত্মক বিপদ আটকায়?
চলন্ত সিঁড়িতে এই ধরনের দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করতেই দুই পাশে এই কালো ব্রাশগুলো বসানো হয়। প্রযুক্তিগত ও চলতি ভাষায় একে বলা হয় ‘স্কার্ট ডিফ্লেকটর’ (Skirt Deflector)। এর মূলত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে:
১. ফাঁকা জায়গা ঢেকে রাখা: ব্রাশের শক্ত ও ঘন রোঁয়াগুলো ওই বিপজ্জনক ফাঁকটাকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে রাখে। ফলে জামাকাপড়ের কোনো অংশ বা জুতো সহজে সেই সরু ফাঁকের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।
২. স্পর্শের মাধ্যমে সতর্ক করা: সিঁড়িতে দাঁড়ানোর পর আপনার অজান্তেই যদি পা বা পোশাক দেওয়ালের খুব বেশি কাছে চলে যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশটির খসখসে স্পর্শ পায়ে এসে লাগে। এই মৃদু স্পর্শ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ তৎক্ষণাৎ সচেতন হয়ে যান এবং নিজের অজান্তেই পা বা পোশাক কিছুটা ভেترের দিকে সরিয়ে নেন। এটি প্রকৌশল বিদ্যার এক অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও কার্যকরী সুরক্ষা ব্যবস্থা!

সুরক্ষার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম:
বিশ্বজুড়ে সামান্য অসাবধানতার কারণে চলন্ত সিঁড়িতে মাঝেমধ্যেই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। তাই বর্তমানের আধুনিক এসকেলেটরগুলিতে সিঁড়ির দুই ধারের শেষ প্রান্তে উজ্জ্বল হলুদ রঙের দাগ বা বর্ডার দেওয়া থাকে, যা দেখে খুব সহজেই বোঝা যায় যে জুতো বা পা ঠিক কোন জায়গায় রাখা উচিত। পাশাপাশি, কোনো কারণে যদি কোনো বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি থামিয়ে দেওয়ার জন্য দুই প্রান্তেই লাল রঙের ‘ইমার্জেন্সি স্টপ’ বোতাম বা সুইচ থাকে।

তাই পরবর্তী সময়ে যখনই আপনি কোনো চলন্ত সিঁড়িতে উঠবেন, তখন সর্বদা সোজা হয়ে সাবধানে দাঁড়ান, ছোট শিশুদের হাত শক্ত করে ধরে রাখুন এবং নিজের পোশাক-আশাক সামলে রাখুন। আর হ্যাঁ, ওই কালো ব্রাশে জুতো ঘষার ভুল আর কখনও করবেন না, বরং মনে রাখবেন—ওটা আপনার জুতো সাফ করার জন্য নয়, বরং আপনাকে সমস্ত দুর্ঘটনার হাত থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্যই তৈরি!