হরমুজ প্রণালীতে আটকে ১৫০০ জাহাজ! বিশ্বজুড়ে ভয়ংকর সামুদ্রিক বিপদের চরম ঘণ্টা বাজাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা!

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের জেরে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস ধরে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে প্রায় ১,৫০০-রও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ অলসভাবে আটকে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে স্থির হয়ে থাকা এসব জাহাজের পানির নিচে নিমজ্জিত হাল এবং প্রপেলারে বিভিন্ন আক্রমণাত্মক সামুদ্রিক জীবের অস্বাভাবিক উপনিবেশ গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক উদ্বেগজনক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে যে, সংঘাত থামার পর এই জাহাজগুলো যখন আবার সমুদ্রপথে চলাচল শুরু করবে, তখন তা বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর এক নজিরবিহীন পরিবেশগত মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বায়োলজিক্যাল ইনভেশনস নামক মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত এই যৌথ গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এবং উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশনসহ বিশ্বের ২৪ জন শীর্ষস্থানীয় সামুদ্রিক বিজ্ঞানী। গবেষকদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের উষ্ণ জলে দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে জাহাজগুলির এই স্থির অবস্থান সামুদ্রিক আক্রমণাত্মক প্রজাতির বিস্তারের এক বিশাল ‘সুপার-স্প্রেডার’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সামুদ্রিক শিল্পে এই প্রক্রিয়াকে ‘বায়োফাউলিং’ বলা হয়, যেখানে জাহাজের গায়ে ধীরগতিতে আঠালো স্লাইম স্তর তৈরির মাধ্যমে শৈবাল, বার্নাকল, মাশেল এবং বিভিন্ন ক্ষতিকারক অমেরুদণ্ডী প্রাণী বংশবিস্তার করে।

উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশনের বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী ক্যারোলিন টেপোল্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, এই আক্রমণাত্মক প্রজাতিগুলি নতুন কোনো উপকূলীয় অঞ্চলে পৌঁছানোর পর সেখানকার স্থানীয় সামুদ্রিক পরিবেশের সঙ্গে অতি দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম। একবার এরা কোনো নতুন বন্দরে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুললে তাদের চিরতরে নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে একদিকে যেমন উপকূলীয় সামুদ্রিক প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনই বিভিন্ন দেশের বন্দর পরিকাঠামো এবং সামুদ্রিক অর্থনীতিও চরম সঙ্কটের মুখে পড়ে। বিশেষ করে এশিয়ান গ্রিন মাশেলের মতো অত্যন্ত আগ্রাসী প্রজাতিগুলি এর আগেও ক্যারিবিয়ান সাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করেছে।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা বা আইএমও-এর কঠোর নির্দেশিকা অনুসারে, তিরিশ দিনের বেশি সময় ধরে অচল থাকা যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজ সমুদ্রযাত্রার পূর্বে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বায়োফাউলিং পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জাহাজগুলোর গায়ে জমে থাকা অতিরিক্ত সামুদ্রিক জীবের কারণে জাহাজের গতিতে যে ঘর্ষণ বা ড্র্যাগ সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে বিশ্বব্যাপী শিপিং শিল্পের জ্বালানি খরচ এবং কার্বন নির্গমন প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। গবেষক দলটি অবিলম্বে সমস্ত শিপিং অপারেটর, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ মন্ত্রকগুলোর প্রতি জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বন্দরগুলোতে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।