স্রেফ নিম্নচাপ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা! সমুদ্রের উষ্ণায়নে কলকাতায় নামল প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টি, কীসের ইঙ্গিত বিশেষজ্ঞদের?

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক বিরল ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার সাক্ষী থাকল কলকাতা। গত সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত টানা ২৫১.৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে শহর কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে এত বৃষ্টি ১৯৮৬ সালের পর আর দেখা যায়নি। এমনকি, গত ১৩৭ বছরে এটিই ষষ্ঠ সর্বাধিক একদিনের বৃষ্টিপাত।
বিশেষজ্ঞরা একমত, এই অস্বাভাবিক বর্ষণ কোনো সাধারণ মৌসুমি ঘটনা নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব।
সমুদ্রের উষ্ণায়নই মূল কারণ
স্কাইমেট ওয়েদারের ভাইস প্রেসিডেন্ট মহেশ পালওয়াত জানান, ওড়িশা ও তার আশেপাশে স্থায়ী নিম্নচাপ তৈরি হওয়ায় কলকাতার আকাশে ঘন বজ্রগর্ভ মেঘ জমে ওঠে। বঙ্গোপসাগর থেকে টানা জলীয় বাষ্প ঢুকতে থাকায় মেঘগুলি দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি সঞ্চয় করে এবং অল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাত ঘটায়।
তাঁর মতে, “বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়ন এর মূল কারণ। সমুদ্রের তাপমাত্রা যত বাড়বে, নিম্নচাপ তত বেশি আর্দ্রতা টেনে নেবে। ফলে ভবিষ্যতে আরও তীব্র বর্ষণের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের।”
বিশ্ব উষ্ণায়নের উদাহরণ
জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. রঘু মুর্তুগুদ্দে এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া একাধিক টাইফুন বিপুল পরিমাণে আর্দ্রতা শোষণ করছে। এই বিশাল সিস্টেমগুলি উত্তর ভারত মহাসাগর থেকে আর্দ্রতা টেনে নিম্নচাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, “কলকাতার এই বর্ষণ স্থানীয় ঘটনা নয়। এটি বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবের একটি দৃষ্টান্ত। সমুদ্র উষ্ণ হলে বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি জলীয় বাষ্প মেশে, আর তার ফলেই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত দেখা দেয়।”
ভারত মহাসাগর নিয়ে ভয়ঙ্কর সতর্কতা:
গবেষণা বলছে, শিল্পযুগের পর থেকে বিশ্ব মহাসাগরের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ভারত মহাসাগরে এই উষ্ণতা সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ বা ‘মেরিন হিটওয়েভ’ বাড়ছে, যা আগে বছরে গড়ে ২০ দিন স্থায়ী হত। কিন্তু ভবিষ্যতে তা ২০০ দিনেরও বেশি স্থায়ী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ অবস্থায় ভারত মহাসাগর প্রায় স্থায়ী তাপপ্রবাহ অঞ্চলে পরিণত হবে, যা সরাসরি বর্ষার চরিত্র বদলে দেবে এবং এ ধরনের প্রলয়ঙ্কর বর্ষণ আরও ঘন ঘন দেখা যাবে।
মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস:
প্রবল বর্ষণে শহরের বহু এলাকা প্লাবিত হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, “আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। সাধারণ মানুষের অসুবিধা লাঘবের জন্য সরকার সর্বতোভাবে পাশে রয়েছে। প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলাতে পরিকাঠামো উন্নয়নের পদক্ষেপও নেওয়া হবে।”
কলকাতার এই সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রমাণ।