স্মার্টফোনে ‘সঞ্চার সাথী’ বাধ্যতামূলক: কেন্দ্র সরকারের সিদ্ধান্তে ‘সরকারি ট্র্যাকার’ হওয়ার আশঙ্কা, বিতর্ক শুরু গোপনীয়তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে

সাইবার সুরক্ষা জোরদার করার নামে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার এক বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবার থেকে ভারতে বিক্রি হওয়া প্রতিটি নতুন স্মার্টফোনে বাধ্যতামূলকভাবে ‘সঞ্চার সাথী’ (Sanchar Sathi) অ্যাপ প্রি-ইনস্টল করতে হবে এবং ব্যবহারকারী এটি মুছতে পারবেন না। সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সিম-বাইন্ডিং বিতর্ক থামার আগেই এই কঠোর নির্দেশ জারি হল।

সরকারের নির্দেশিকা ও প্রেক্ষাপট

রয়টার্স জানিয়েছে, টেলিকম দফতর (DoT) ইতিমধ্যেই অ্যাপেল, স্যামসাং, শাওমি, ভিভো-সহ স্মার্টফোন নির্মাতাদের নির্দেশ পাঠিয়েছে। পুরোনো ফোনগুলিতেও ওভার-দ্য-এয়ার (OTA) সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে অ্যাপটি চাপিয়ে দেওয়া হবে। ভারতে অপসারণ-অযোগ্য সরকারি অ্যাপ বাধ্যতামূলক করার ঘটনা এটিই প্রথম।

সরকারি ব্যাখ্যায় এটিকে সুরক্ষা, ফোন ট্র্যাকিং ও প্রতারণা রোধে উপকারী বলা হলেও, বিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারীদের বড় অংশ মনে করছেন—এর আড়ালে ব্যক্তিগত পরিসরে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ শুরু হলো।


সঞ্চার সাথী কী এবং এর সুবিধাগুলি কী?

 

সঞ্চার সাথী হলো সরকারি টেলিকম দফতরের উদ্যোগে তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম, যার লক্ষ্য:

  • সাইবার সুরক্ষা: মোবাইল সাবস্ক্রাইবারদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সাইবার প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন করা।

  • ফোন ট্র্যাকিং: চুরি বা হারিয়ে যাওয়া ফোন খুঁজে পেতে সাহায্য করা। IMEI নম্বর ব্যবহার করে হারানো ফোন ব্লক ও ট্র্যাক করা যায়।

  • সংযোগ যাচাই: নিজের নামে চলা সন্দেহজনক মোবাইল সংযোগ শনাক্ত করা (নিজের নামে মোট কতগুলি সিম চলছে তা চেক করা)।

  • ‘চক্ষু’ (Chakshu): এটি সাইবার প্রতারণা রিপোর্ট করার সেবা। ব্যাঙ্ক/KYC ফিশিং কল, TRAI/DoT ছদ্মবেশ, পুলিশের ছদ্মবেশ, স্ক্যাম ইত্যাদি রিপোর্ট করা যায়। তবে এটি সাইবার অপরাধের অভিযোগ জানানোর পোর্টাল নয়।


কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে এত বিতর্ক?—৫টি বড় কারণ

 

বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর প্রধান কারণগুলি হলো:

কারণ বিতর্কের মূল বিষয়
১. ‘সরকারি ট্র্যাকার’ হওয়ার আশঙ্কা অ্যাপটি এখন চুরি যাওয়া ফোন ট্র্যাক করলেও, অপসারণ-অযোগ্যভাবে অপারেটিং সিস্টেমে ঢুকলে এটি সরকারের জন্য একটি সর্বক্ষণিক ট্র্যাকিং টুলে পরিণত হতে পারে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে ডিজিটাল আইডি বা মেসেজ ট্র্যাকিং যোগ হতে পারে।
২. ব্যক্তিগত পরিসরে সরাসরি হস্তক্ষেপ মোবাইল ফোন ব্যক্তিগত পরিসরের অংশ। প্রশ্ন উঠছে—ফোনে থাকা সংবেদনশীল তথ্য, এনক্রিপ্টেড নয় এমন ফাইল বা মেসেজে সরকার প্রবেশ করবে না—এর নিশ্চয়তা কোথায়? এটিকে গোপনীয়তার উপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৩. ডেটা সুরক্ষা আইনে ছাড় সরকার বহু ক্ষেত্রে ডেটা প্রোটেকশন আইনের বাইরে নিজেকে রাখার ব্যবস্থা করেছে। বাধ্যতামূলক সরকারি অ্যাপ সেই দিকটিকেই উন্মোচিত করছে, যেখানে বেসরকারি সংস্থার মতো সরকারের দায়বদ্ধতা তুলনামূলকভাবে কম।
৪. ‘ব্লোটওয়্যার’ এবার সরকারি রূপে অনেক ফোনেই আগে থেকে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বা ডিলিট করা যায় না এমন বাণিজ্যিক সফ্টওয়্যার (ব্লোটওয়্যার) থাকে। কিন্তু এবার সরকার নিজেই এটি চাপিয়ে দিচ্ছে। সাইবার বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এটি ব্যবহারকারীদের স্বাধীনতা হরণ
৫. জনপরামর্শ ছাড়া চাপানো এই নীতি বাধ্যতামূলক করার আগে দূরসংযোগ দফতরের পক্ষ থেকে কোনো জনপরামর্শ বা খসড়া নীতি প্রকাশ করা হয়নি। সমালোচকদের মতে, এটি একটি গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy