স্বামী হত্যায় গৃহবধূ ও প্রেমিকের চক্রান্ত, একটি ভুল ভেস্তে দিল সব!

পারিবারিক অশান্তি, স্বামীর অত্যাচার আর নতুন জীবনের স্বপ্ন – এই সব কিছুর মিশেলে এক ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে এনেছে দিল্লি পুলিশ। আলিপুরের বাসিন্দা প্রীতম প্রকাশ (৪২) নামের এক ব্যক্তিকে তাঁর স্ত্রী সোনিয়া (৩৪) এবং তাঁর প্রেমিক রোহিত, যিনি পেশায় ক্যাব চালক, মিলে নির্মমভাবে খুন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে, প্রেমিক রোহিতের একটি সাধারণ ভুলই ভেস্তে দিয়েছে তাঁদের সুচিন্তিত পরিকল্পনা।

অশান্তির সূত্রপাত ও নতুন সম্পর্ক

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত প্রীতম প্রকাশ দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একাধিক মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। আদালত তাঁকে পলাতক ঘোষণা করেছিল। প্রীতমের স্ত্রী সোনিয়ার অভিযোগ, তাঁর স্বামী মাদকাসক্ত ছিলেন এবং নেশার ঘোরে প্রায়ই তাঁকে মারধর করতেন। বারবার চেষ্টা করেও সোনিয়া স্বামীকে ভালো পথে ফেরাতে পারেননি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে প্রীতমকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সোনিয়া। তাঁদের একটি পুত্র ও দুই কন্যা সন্তান থাকলেও, পাঁচজনের সংসারে শান্তির লেশমাত্র ছিল না।

এই অশান্তির মধ্যেই ২০২৩ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় রোহিত নামের এক ক্যাব চালকের সঙ্গে সোনিয়ার আলাপ হয়। রোহিতেরও অপরাধমূলক অতীত ছিল; একবার তাঁর নাম খুনের মামলাতেও জড়িয়েছিল। তা সত্ত্বেও, রোহিতের সঙ্গে সোনিয়ার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে এবং দু’জনে মিলে নতুন করে সংসার পাতার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাঁদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান প্রীতম।

খুনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

২০২৩ সালের ২ জুলাই, প্রীতমের সঙ্গে তীব্র অশান্তি হলে সোনিয়া সোনিপতে নিজের বোনের বাড়িতে চলে যান। রোহিতই তাঁকে গাড়িতে করে সেখানে পৌঁছে দিয়েছিলেন। পথেই প্রীতমকে খুন করার কথা প্রেমিককে জানান সোনিয়া। রোহিত তখনই জানিয়ে দেন যে তিনি নিজে প্রীতমকে মারতে পারবেন না, তবে ৬ লক্ষ টাকা দিলে একজন খুনি ভাড়া করে দেবেন। সোনিয়ার পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি, তাই প্রথম পরিকল্পনা সেখানেই থমকে যায়।

এরপর আসে ‘প্ল্যান বি’। ৫ জুলাই, প্রীতম স্ত্রীকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে সোনিপতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সোনিয়া রাজি ছিলেন না, ফলে তাঁদের মধ্যে আবারও অশান্তি হয়। এর পরই সোনিয়া তাঁর বোনের শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়, বিজয়কে প্রস্তাব দেন প্রীতমকে খুন করলে ১ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। আলোচনার পর ৫০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়।

পুলিশি জেরায় সোনিয়া জানান, ঘটনার দিন রাতে তিনি প্রীতমকে তাঁর বোনের বাড়িতেই থেকে যেতে বলেন। এরপর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে বিজয়কে লুকিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে আসেন। দু’জনে মিলে প্রীতমকে খুন করে তাঁর দেহ চাদরে মুড়ে ড্রেনের ধারে ফেলে দেয়। সোনিয়া স্বামীর মোবাইল নিজের কাছেই রেখে দেন। পরে আলিপুর থানায় তিনি স্বামীর ‘মিসিং’ ডায়রিও করেন।

একটি ভুলে ভেস্তে গেল সব

প্রীতমের মোবাইল ফোন নষ্ট করে দেওয়ার জন্য সোনিয়া সেটি রোহিতকে দিয়েছিলেন। কিন্তু রোহিত ফোনটি নষ্ট না করে নিজেই ব্যবহার করতে শুরু করেন, আর এখানেই ঘটে বিপত্তি। মাস কয়েক পর দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ প্রীতমের খোঁজে তদন্ত শুরু করে। প্রীতমের মোবাইল ট্র্যাক করে জানতে পারে যে সেটি সোনিপত এলাকায় এখনও কেউ ব্যবহার করছে। এরপর পুলিশ রোহিতের উপর নজর রাখতে শুরু করে এবং তদন্তে রোহিতের পুরনো অপরাধের খোঁজও মেলে। সন্দেহ হওয়ায় তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

জেরা শুরু হলে রোহিত প্রথমে বলেন যে, ফোনটি তিনি কিনেছেন। পরে পুলিশের চাপে পড়ে তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি এবং সোনিয়া একসঙ্গে খুনের পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রীতমকে খুন করে দেহ ফেলে দেওয়া হয়েছিল, আর ফোন নষ্ট না করে তিনি নিজের কাজেই ব্যবহার করছিলেন।

রোহিতের বয়ানের ভিত্তিতে পুলিশ সোনিয়াকে গ্রেফতার করে। শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে খুনে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে নেন ওই মহিলা। তিনি জানান যে, খুনের পর বিজয়কে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। পরে প্রীতমের একটি গাড়ি বিক্রি করে ২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন, যার এক ভাগ রোহিতকে দেন এবং বাকিটা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, হরিয়ানা পুলিশ আগে ওই অজ্ঞাত মৃতদেহটি শনাক্ত করতে পারেনি। তবে তাদের কাছে ডিএনএ নমুনা ছিল। এখন সেই নমুনা মিলিয়ে প্রীতমের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। এই ঘটনায় পারিবারিক কলহ, অপরাধ প্রবণতা এবং একটি ছোট্ট ভুল কিভাবে একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পর্দা ফাঁস করে দিল, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy