স্বাধীনতার পর থেকে কতবার বদলেছে ১০ টাকার নোট? জানলে অবাক হবেন এই অজানা ইতিহাস!

ভারতীয় মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ১০ টাকার নোট দৈনন্দিন খুচরো লেনদেনের একটি অত্যন্ত অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আমরা পকেটে যে নোটটি নিয়ে প্রতিদিন চলাফেরা করি, তার চেহারা কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে সবসময় একরকম ছিল না। দেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সবচেয়ে বড় কথা জালিয়াতি রোধ ও নিরাপত্তার স্বার্থে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) স্বাধীনতার পর থেকে ১০ টাকার নোটের নকশায় ও আকারে প্রায় ৮ থেকে ১০ বার বড় ও ছোট পরিবর্তন এনেছে। নোটের এই ঐতিহাসিক বিবর্তন ভারতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক অনন্য অধ্যায়।
নোটের ঐতিহাসিক যাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায়, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া ১৯৩৮ সালে প্রথমবার ১০ টাকার নোট বাজারে আনে। তবে পরবর্তীকালে কালো টাকার লেনদেন কঠোরভাবে রুখতে ১৯৪৬ সালে এটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর দীর্ঘ আট বছর পর, ১৯৫৪ সালে পুনরায় ১০ টাকার নোটের প্রচলন শুরু হয়, যা আজ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে প্রধানত চারটি প্রধান সিরিজের মাধ্যমে এই নোটটি বর্তমান রূপ লাভ করেছে।
প্রথমত, ‘লায়ন ক্যাপিটাল সিরিজ’ (১৯৫৪-১৯৬৭) ছিল স্বাধীন ভারতের একেবারে প্রথম সিরিজ। এই নোটটিতে প্রথমবার অশোক স্তম্ভ বা ‘লায়ন ক্যাপিটাল’ স্থান পেয়েছিল এবং এর উল্টো পিঠে খোদাই করা ছিল দুটি সুন্দর ময়ূরের ছবি। দ্বিতীয়ত, ১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধীর জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে তাঁর ছবি সংবলিত নতুন নোট বাজারে আনা হয়, যা ‘মহাত্মা গান্ধী সিরিজ’ (১৯৬৯-১৯৯৬) নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ১৯৭০, ১৯৭৫ এবং ১৯৮৮ সালেও এর ছোটখাটো ডিজাইন ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যে সংস্কার করা হয়।
তৃতীয়ত, জাল নোটের কারবার চিরতরে রুখতে ১৯৯৬ সালে একেবারে নতুন নিরাপত্তা ফিচারসহ ‘মহাত্মা গান্ধী নিউ সিরিজ’ চালু করা হয়। এই সিরিজের নোটগুলিতে প্রথমবারের মতো ওড়িশার ঐতিহাসিক কোনার্কের সূর্য মন্দির স্থান পায় এবং ২০১১ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় অফিসিয়াল টাকা প্রতীক। চতুর্থ এবং বর্তমান ধাপটি শুরু হয় ২০১৮ সালে, যখন ১০ টাকার নোট সম্পূর্ণ নতুন চকলেট ব্রাউন রঙে আত্মপ্রকাশ করে। ‘মহাত্মা গান্ধী নতুন চকলেট ব্রাউন সিরিজ’ নামে পরিচিত এই নোটটির মাপ নির্ধারণ করা হয় ১২৩ মিমি × ৬৩ মিমি। তবে এর পিছনে ঐতিহ্যবাহী কোনার্কের সূর্য মন্দির ও চাকার মোটিফ অপরিবর্তিত রাখা হয়।
নোটের নকশা বারবার বদলানোর পেছনে মূলত জাল নোট কারবারীদের রুখে দেওয়া এবং নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করাই প্রধান উদ্দেশ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক উন্নত জলমার্ক, অত্যাধুনিক সিকিউরিটি থ্রেড এবং ‘সি-থ্রু রেজিস্টার’-এর মতো ডিজিটাল ফিচার যুক্ত করে নোটকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও অনেক বেশি নিরাপদ করে তুলেছে। একই সঙ্গে ভারতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে এই বদল অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে প্রচলিত ১০ টাকার নোটের সামনের অংশে মহাত্মা গান্ধীর ছবি ও আরবিআই গভর্নরের স্বাক্ষর থাকে, আর পিছনের অংশে ১৭টি আঞ্চলিক ভাষায় মুদ্রার মান এবং কোনার্কের সূর্য মন্দির শোভা পায়। স্বাধীনতার সময়কার সিংহ প্রতীক থেকে আজকের আধুনিক চকলেট ব্রাউন রূপ—১০ টাকার এই নোটের দীর্ঘ রূপান্তর ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক জীবন্ত দলিল।