স্কুলে এবার বাধ্যতামূলক যৌন-শিক্ষা, কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের, সুপ্রিম কোর্টে জমা রিপোর্ট!

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তা, অধিকার সুরক্ষা এবং যৌনতা সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্কুলগুলোতে যৌন-শিক্ষা (Sex Education) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে কেন্দ্র। এই উদ্যোগের বিস্তারিত রূপরেখা এবং সুপারিশ ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ আদালতের সবুজ সংকেত মিললেই দেশজুড়ে এই নতুন পাঠ্যক্রম কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি. ভি. নাগরত্ন এবং বিচারপতি আর. মহাদেবনের ডিভিশন বেঞ্চে এই সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি চলছে। আদালতের মূল উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ক এবং শিশুদের যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা আইন (POCSO)-এর প্রয়োগ। আদালত লক্ষ্য করেছে, অনেক ক্ষেত্রেই পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ককেও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে POCSO আইনের অধীনে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী আইনি জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে কেন্দ্র নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি ২৬ সদস্যের জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। টাটা সমাজবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা-মনোবিদ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বাস্তবসম্মত পাঠ্যক্রম তৈরির সুপারিশ করেছে। কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই বয়সভিত্তিক যৌন-শিক্ষা চালু করা হবে। ছোটদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া থেকে শুরু করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্মতির গুরুত্ব, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং কৈশোরের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

কমিটির সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি স্কুলে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে, যারা সপ্তাহে অন্তত দু’দিন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের সচেতনতামূলক পাঠ দেবেন। শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, যৌন-শিক্ষা নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা ও জড়তা কাটাতে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের জন্যও বিশেষ সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। বিচারপতি নাগরত্ন শুনানির সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়স কিশোর-কিশোরীদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই বয়সের প্রতিটি সম্পর্ককে সরাসরি পুলিশি তদন্ত বা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আনা গণতান্ত্রিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী।

বিচারপতির মতে, শিশুদের সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর অযথা কঠোর আইনি পরিণতি চাপিয়ে দেওয়া তাদের কর্মজীবন ও পড়াশোনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞ কমিটির এই সুপারিশগুলো এখন শীর্ষ আদালতের বিচারাধীন। আদালত যদি এই প্রস্তাবনায় সম্মতি দেয়, তবে দেশের সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলোতে যৌন-শিক্ষা একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এটি কেবল অপরাধ কমাতেই সাহায্য করবে না, বরং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও গড়ে তুলবে। স্কুল পর্যায়ে এই বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ।