স্কুলের ভিড় কেন একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়? শিক্ষার্থীদের জন্য চাই ‘শান্ত কক্ষ’ ও ‘থার্ড স্পেস’—বাস্তব সমাধানের পথে গবেষকরা!

আমরা সাধারণত স্কুলকে বন্ধুত্ব গড়ার জায়গা হিসেবে ভাবলেও, এক সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাস্তবে অনেক তরুণ-তরুণী ব্যস্ত ক্লাসরুম ও করিডরের মাঝেই নিজেকে আবেগগতভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। গবেষকদের মতে, একাকীত্ব শুধু একা থাকার কারণে নয়, বরং ক্ষতিকর সামাজিক গতিশীলতার ফলেও তৈরি হয়। অর্থাৎ, পাশে অনেক সহপাঠী থাকা সত্ত্বেও যদি পরিবেশ নিরাপদ না মনে হয়, তাহলে সেই উপস্থিতি বরং একাকীত্বকে আরও গভীর করে তোলে।
ফ্লিন্ডারস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গবেষক বেন লোহমেয়ার বলেন, “প্রবীণদের মতো নয়, তরুণরা প্রায়ই বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় কাটায় এমন মানুষের সঙ্গে, যাদের সঙ্গে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তাই একাকীত্ব এখানে বিচ্ছিন্নতার চেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত।”
‘আবেগজনিত সহিংসতা’: কেন প্রচলিত ধারণা ভুল?
প্রচলিত ধারণা হলো, শিক্ষার্থীদের ‘বাইরে বেরোনো’ বা ‘মিশে যাওয়া’ উচিত। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, যদি সেই ভিড়েই থাকে ঠাট্টা, বর্জন বা মর্যাদা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা, তাহলে সমাধান কার্যকর হয় না। কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তাহীন পরিবেশ একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
গবেষণায় সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বোর্দিয়ুর তত্ত্ব থেকে ধারণা নিয়ে এই প্রক্রিয়াকে “আবেগজনিত সহিংসতা” বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত বুলিং বা কটূক্তি নয়, বরং স্কুলজীবনের সামাজিক কাঠামো, নিয়ম ও শ্রেণিবিন্যাস থেকেও আসে।
লোহমেয়ার বলেন, “আমাদের ফলাফল দেখায়, একাকীত্ব আর বুলিংকে কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এগুলো স্কুলব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত অসমতা ও আবেগগত ক্ষতির অংশ।” গবেষকরা মনে করেন, বুলিংয়ের মতো একাকীত্বকেও একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত।
সমাধান কী? স্কুলের কাঠামো পুনর্গঠন
স্কুলের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা ভিড়ের মাঝেই আর একা বোধ না করে। গবেষকরা কিছু বাস্তব পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন:
১. শান্ত কক্ষ বা “Quiet Rooms”: এমন কক্ষ রাখা, যেখানে শিক্ষার্থীরা চাপমুক্তভাবে থাকতে পারে।
২. তৃতীয় স্থান বা “Third Spaces”: হটস্পটের বাইরে বিকল্প পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে মেশা যায়।
৩. অপ্ট-ইন জোন: শিক্ষকরা সম্মান ও সহমর্মিতার পরিবেশ দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ জায়গা তৈরি করবেন।
৪. মেন্টরশিপ: ভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের মেন্টরশিপে জড়ালে কঠোর স্তরবিন্যাস ভেঙে যেতে পারে।
৫. পুনরুদ্ধারমূলক পদ্ধতি: শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে পুনরুদ্ধারমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করলে আবেগগত নিরাপত্তা বাড়ে।
লোহমেয়ারের মতে, একাকীত্বকে সামাজিক সহিংসতার এক রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে, শিক্ষক ও প্রশাসকরা রুটিন বদলাতে, তদারকি পুনর্ভাবনা করতে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে গড়তে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পাবেন। মূল প্রশ্ন একটাই: দিনের শেষে যে শিক্ষার্থী তার জায়গা নিয়ে সবচেয়ে অনিশ্চিত, তার জন্য কি পরিবেশটা নিরাপদ হল?