সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়! দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের জন্য এবার কি পুরোপুরি ঐচ্ছিক হলো APAAR ID?

শিক্ষা জগতের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এপিএএআর আইডি (APAAR ID) সংক্রান্ত একটি যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছে। একটি বিশেষ আবেদনের শুনানি গ্রহণ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ওড়িশা হাইকোর্টের আগের একটি সিদ্ধান্তকে পুরো দেশে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। উল্লেখ্য, ওড়িশা হাইকোর্ট এর আগে তাদের এক আদেশে স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে ছাত্রছাত্রীদের জন্য এপিএএআর আইডি তৈরি করা সম্পূর্ণভাবে ঐচ্ছিক বা স্বেচ্ছামূলক হওয়া উচিত। সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিক নির্দেশের ফলে এখন থেকে দেশের প্রতিটি কোণায় বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের জন্য এপিএএআর আইডি তৈরি করা আর কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় থাকছে না, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো। এর পাশাপাশি, শীর্ষ আদালত এপিএএআর আইডি বিধিমালা সম্পর্কিত সাধারণ মানুষের তথ্য সুরক্ষা এবং গোপনীয়তার উদ্বেগগুলো গভীরভাবে তদন্ত করে দেখার জন্য সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন বা সিবিএসই-কে কঠোর নির্দেশও প্রদান করেছে। আসুন, এই পুরো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখে বুঝে নেওয়া যাক যে আসলে এই এপিএএআর আইডি কী, কেন এটি চালু করা হয়েছিল এবং এই বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ঠিক কী কী কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে।
বাধ্যতামূলক আধার-সংযুক্ত এপিএএআর আইডি তৈরির প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানির সময়ই মূলত সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সামনে আসে। মামলার শুনানিকালে সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত জোরালোভাবে জানিয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের এপিএএআর আইডি তৈরি করার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে স্বেচ্ছামূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়। শুধু তাই নয়, আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে যে এপিএএআর আইডি তৈরির জন্য যে সম্মতিপত্র বা কনসেন্ট ফর্ম দেওয়া হবে, তাতে এই প্রক্রিয়া থেকে যেকোনো সময় বেরিয়ে যাওয়ার বা ‘অপট-আউট’ (Opt-out) করার একটি স্পষ্ট ও সহজ বিকল্প অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বিশেষ বেঞ্চ মৌখিকভাবে এই মর্মে মন্তব্য করেছে যে, আদালত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে খুব শীঘ্রই বিস্তারিত ও যথাযথ লিখিত আদেশ জারি করবে। মূলত আবেদনে জোরালো যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, এই ধরনের বাধ্যতামূলক নিয়ম নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন ঘটাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই এপিএএআর আইডি (APAAR ID) আদতে কী? তথ্য বলছে, এপিএএআর আইডি হলো ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুদূরপ্রসারী ‘এক দেশ, এক শিক্ষার্থী আইডি’ (One Nation, One Student ID) মহাপ্রকল্পের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অধীনে দেশের প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে একটি করে অনন্য ১২-সংখ্যার ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা এপিএএআর আইডি প্রদান করার কথা রয়েছে। এই বিশেষ ডিজিটাল আইডিতে একজন শিক্ষার্থীর জন্ম থেকে শুরু করে সমস্ত শিক্ষাগত তথ্য, যেমন—স্কুলের বিভিন্ন রেকর্ড, মার্কশিট, অর্জিত সার্টিফিকেট, ডিগ্রি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক নথি নিরাপদে সংরক্ষণ করা থাকবে। এর অর্থ দাঁড়াল, ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থীরা এই এপিএএআর আইডি ব্যবহার করে অত্যন্ত সহজে এবং মাত্র এক ক্লিকেই তাদের সমস্ত প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত নথি অ্যাক্সেস করতে পারবে। অন্য কথায়, এই অনন্য ডিজিটাল আইডির মাধ্যমে ভারত সরকার দেশের প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত যেকোনো ছাত্রছাত্রীর শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্ত রেকর্ড সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে চায়। বর্তমানে দেশের বহু রাজ্যেই সমস্ত শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই এপিএএআর আইডি তৈরি করা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের (Dropouts) সঠিক পরিসংখ্যানের ওপর নজর রাখতে এবং তাদের গতিবিধি ট্র্যাক করতে এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে এই গোটা ব্যবস্থার মধ্যেই একটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল যখন সিবিএসই (CBSE) সহ দেশের অন্যান্য রাজ্য শিক্ষা বোর্ডগুলি নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই এপিএএআর আইডি তৈরি করা বাধ্যতামূলক করে দেয়। এমনকি সিবিএসই বোর্ডের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, এপিএএআর আইডি না থাকলে কোনো শিক্ষার্থীই আগামী দিনে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির মূল বোর্ড পরীক্ষার জন্য নিজেদের নাম রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করাতে পারবে না। এই ধরনের কড়া নিয়ম চালুর পরেই ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের একাংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও গোপনীয়তাভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত গড়ায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের এই অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের জন্য এক বিরাট স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।