সিগন্যাল নেই, ট্রাফিক পুলিশও উধাও! মাত্র ১০ হাজার টাকায় ঘুরে আসুন ভারতের এই ‘নীরব শহর’ থেকে

প্রথমবার এই শহরের মাটিতে পা রাখলে আপনার মনে হতে পারে, হঠাৎ করে আপনার শ্রবণশক্তি কমে গিয়েছে কিংবা কেউ কানে তুলো গুঁজে দিয়েছে। এটি কোনো শান্ত প্রত্যন্ত গ্রাম নয়, একটি রাজ্যের রাজধানী শহর। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে বহুতল বাড়ি, দোকানপাট আর গাড়ির লাইন। অথচ ব্যস্ত রাস্তার চাকা ঘুরলেও কোথাও কোনো ‘প্যাঁ-পোঁ’ শব্দ নেই। চালকদের হর্ন বাজানোর কোনো তাড়া নেই, জেব্রা ক্রসিংয়ে পথচারী পা রাখামাত্রই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে সমস্ত যানবাহন। কোনো আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কিংবা ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারি ছাড়াই অত্যন্ত মসৃণভাবে সচল থাকে প্রতিদিনের জনজীবন। এই অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলার কারণেই মিজোরামের রাজধানী আইজলকে বলা হয় ‘ভারতের নীরব শহর’ বা ‘নো হঙ্কিং ক্যাপিটাল অফ ইন্ডিয়া’।

আইজলের এই হর্নহীন সংস্কৃতির পিছনে মূলত তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিগত ২০০৭ সাল থেকে এখানে প্রশাসনিকভাবে ‘নো হঙ্কিং’ বা হর্ন না বাজানোর এক বিশেষ প্রচার অভিযান শুরু হয়। জরুরি অবস্থা বা বড় কোনো বিপদ ছাড়া অনবদ্য কারণে হর্ন বাজালে ৫০০ টাকা জরিমানার নিয়ম চালু করা হয়েছিল, যা আজ স্থানীয় মানুষের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মিজো সমাজের প্রাচীন ‘তলাংমঙ্গাইহনা’ সংস্কৃতি। এই দর্শনের মূল কথাই হলো অন্যের জন্য নিঃস্বার্থ হওয়া। মিজোদের মতে, রাস্তায় অহেতুক হর্ন বাজানো মানে অপরের মানসিক শান্তি ও স্বস্তি নষ্ট করা, যা তাদের সমাজে চরম অসভ্যতা ও অভদ্রতা হিসেবে গণ্য করা হয়। ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি শিশুকে এই সামাজিক পাঠ দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, পাহাড়ি সরু রাস্তায় ওভারটেক করার প্রবণতা মারাত্মক দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে, তাই সবাই ধৈর্য ধরে লাইনে চলাই শ্রেয় মনে করেন। এখানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ নয়, বরং স্থানীয় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যুবকেরা।

আইজল শুধু শব্দহীন নয়, সততার দিক থেকেও এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। এখানকার রাস্তায় চলতে চললে আপনার চোখে পড়বে ‘nghah lou dawr’ বা দোকানদারহীন বিশেষ দোকান। বাঁশের তাকে থরে থরে সাজানো টাটকা সবজি, ফল আর ফুল। পাশে শুধু দাম লেখা একটি ছোট্ট বোর্ড এবং টাকা রাখার একটি কৌটো। সেখানে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা বা পাহারাদার নেই। ক্রেতারা নিজেদের পছন্দমতো জিনিস তুলে নেন এবং নির্দিষ্ট দামটি কৌটোয় ফেলে দেন। খুচরো পয়সার প্রয়োজন হলে ওই কৌটো থেকেই নিজে হিসাব করে তুলে নেন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই ব্যবস্থায় আজ পর্যন্ত কোনো চুরির ঘটনা ঘটেনি।

কলকাতা থেকে মাত্র ২ রাত ৩ দিনের একটি সংক্ষিপ্ত বাজেটের মধ্যে আপনি আইজল ঘুরে আসতে পারেন। মাথাপিছু খরচ পড়বে ৯,৫০০ থেকে ১২,০০০ টাকার মধ্যে। যদি আপনি অন্তত ৪৫ দিন আগে ফ্লাইটের টিকিট কেটে রাখেন, তবে কলকাতা-আইজল রাউন্ড ট্রিপ ৫,৫০০ থেকে ৭,০০০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন। ইন্ডিগো বা অ্যালায়েন্স এয়ারের বিমানে চড়ে নামতে হবে লেংপুই বিমানবন্দরে, যা শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে মাত্র ৩০০ টাকায় শেয়ার ট্যাক্সি পেয়ে যাবেন। থাকার জন্য জিয়ন স্ট্রিটের হোমস্টেগুলি সেরা, যেখানে প্রতি রাতের ভাড়া ১,০০০ টাকা। স্থানীয় ভ্রমণের জন্য স্কুটি ভাড়া পাওয়া যায় মাত্র ৬০০ টাকায়। এছাড়া ১২০ টাকার লোকাল থালি এবং রাস্তার বিখ্যাত ৫০ টাকার মোমো আপনার জিভের স্বাদ মেটাবে। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস আইজল ভ্রমণের সেরা সময়, তবে মনে রাখবেন রবিবার চার্চের দিন হওয়ায় গোটা শহর সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ভারতের এই সবচেয়ে ভদ্র ও সৎ শহরটি আপনাকে এক ভিন্ন সভ্যতার অনুভূতি দেবে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy