‘সর্বজ্ঞানী’র দম্ভের পতনই অনিবার্য! ইন্দিরা-স্মৃতি উসকে তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ মুখ্যমন্ত্রীর

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে, শাসকের মুখ বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে তৈরি হওয়া দম্ভ এবং তার চূড়ান্ত পতনের ইতিহাস বারবার ফিরে আসে এক অমোঘ সত্য হয়ে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুনের সেই অন্ধকার রাত আর সদ্যসমাপ্ত হওয়া ১৫ বছরের একটানা শাসনকাল—এই দুই ভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটকে এক সুতোয় বেঁধে পূর্বতন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দেন, জনতার মতাদর্শকে পদদলিত করে যাঁরা স্বৈরাচারের পথে হাঁটেন, কালের নিয়মে তাঁদের পতন অনিবার্য। ইতিহাস কখনও কোনো দাম্ভিক স্বৈরাচারীকে ক্ষমা করে না।
৫১ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে সংবিধানের ৩৫২ ধারা প্রয়োগ করে সারা ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ। স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সেই ২১ মাসের সময়কাল আজও এক গভীর ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে চিহ্নিত। বৃহস্পতিবার সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকেই নিজের বক্তব্যের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “জরুরি অবস্থার সেই দমবন্ধ করা পরিবেশের সঙ্গে বাংলার বিগত ১৫ বছরের শাসনকালের কার্যত কোনো মৌলিক পার্থক্য ছিল না।” সেই সময়কালে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে কীভাবে খর্ব করা হয়েছিল, এদিন সেই প্রসঙ্গ তুলেই সরব হন তিনি।
রাজনৈতিক আক্রমণের ধার বাড়িয়ে এদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের গণতন্ত্র সম্পর্কিত আপ্তবাক্যটিকে হাতিয়ার করেন শুভেন্দু। বিগত জমানার রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতিকে তীব্র কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যাঁরা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে সবসময় তার বিপরীত মেরুতে হেঁটেছেন, তাঁরা ‘ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’—এই চিরন্তন মূল আদর্শটিকে সম্পূর্ণভাবে বিকৃত করেছিলেন।” এর পরেই সুর চড়িয়ে তিনি মন্তব্য করেন, “নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তাঁরা সেটাকে বানিয়ে তুলেছিলেন ‘ফর দ্য পার্টি, বাই দ্য পার্টি, অফ দ্য পার্টি’।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট। বিগত জমানায় কীভাবে সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে রাজ্যজুড়ে শুধুই চরম দলীয়তন্ত্র কায়েম করা হয়েছিল, সেদিকেই নির্দেশ করেছেন তিনি।
সময়ের চাকা ঘুরলে যে প্রবল পরাক্রমশালী শাসকের সিংহাসনও ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে, এদিন সেই অমোঘ বাস্তবের কথাও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পূর্বতন সরকারের শীর্ষনেত্রীর নাম সরাসরি মুখে না-এনেও তাঁর বিগত শাসনকালের দম্ভ এবং অহংকারকে সরাসরি নিশানা করেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, “ইতিহাস সাক্ষী, স্বৈরাচারের পথে হেঁটে কেউ বেশিদিন রাজত্ব ধরে রাখতে পারেনি। ইন্দিরা গান্ধীর মতো শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রীকেও একসময় ক্ষমতা হারিয়ে প্রাক্তন হতে হয়েছিল।” এর পরেই তিনি যোগ করেন, “আর রাজ্যে গত ১৫ বছরের রাজত্বকালে বাংলায় যিনি নিজেকে ‘সর্বজ্ঞানী’ বলে মনে করতেন, যাঁর অহংবোধ আকাশ ছুঁয়েছিল, বাংলার মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে তাঁর সেই অহংকার চূর্ণ করে যোগ্য জবাব দিয়েছে।”
বৃহস্পতিবার রথীন্দ্র মঞ্চে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে জরুরি অবস্থার সময় যে সমস্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন এবং অবর্ণনীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানমঞ্চ থেকে সমাজ ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিশা নির্দেশ করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রই সর্বোপরি। ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’র নীতিতেই এগোতে হবে।” একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস করার মতো কার্যকলাপ থেকে রাজনীতিকে সর্বতোভাবে দূরে রাখার কড়া বার্তাও দেন তিনি। সবশেষে বাংলার আপামর জনসাধারণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর নিজের পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে আগামী দিনে এক সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।