সমুদ্রের বুকে ইতিহাস! ভারতীয় নৌবাহিনীকে আরও অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে জলে ভাসল সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘শ্রুতি’

ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তিতে আরও এক নতুন ও ঐতিহাসিক সংযোজন ঘটল। কলকাতার স্বনামধন্য গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (GRSE)-এর প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য বিশেষভাবে তৈরি নেক্সট জেনারেশন অফশোর পেট্রল ভেসেল (NGOPV) বা ‘শ্রুতি’। দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় নজরদারি জোরদার করা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতেই এই অত্যাধুনিক পেট্রল ভেসেলটি তৈরি করা হয়েছে। সমুদ্রে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি চালানো থেকে শুরু করে জলদস্যু দমন এবং কৌশলগত অভিযান—নৌবাহিনীর সামুদ্রিক শক্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে জলে ভাসানো হল রণতরী ‘শ্রুতি’কে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩ হাজার টন ডিজাইন ডিসপ্লেসমেন্টের এই যুদ্ধজাহাজটির দৈর্ঘ্য ১১৩ মিটার এবং প্রস্থ ১৪.৬ মিটার। জাহাজটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ২৩ নট। পাশাপাশি, ১৪ নট গতিতে বজায় রেখে এটি একটানা প্রায় ৮,৫০০ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে মোতায়েন রেখে বিভিন্ন ধরনের জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত সহজ হবে। শুধু নজরদারি বা টহলদারিই নয়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বহুমুখী ভূমিকায় সফলভাবে ব্যবহার করা যাবে এই এনজিওপিভি-কে (NGOPV)। সমুদ্রসীমা সুরক্ষা, কনভয় অপারেশন, জলদস্যু দমন, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, অস্ত্র পাচার ও চোরাশিকার বিরোধী অভিযান—সবক্ষেত্রেই অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারবে এই রণতরী। পাশাপাশি, সমুদ্রে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (অনুসন্ধান ও উদ্ধার), মানবিক সহায়তা এবং যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার কাজেও সমানভাবে ব্যবহার করা যাবে ‘শ্রুতি’কে।
জাহাজটিতে সংযোজন করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা অত্যাধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার ও উন্নত সেন্সর সিস্টেম। এর পাশাপাশি এতে রয়েছে ইন্টিগ্রাল হেলিকপ্টার পরিচালনার সুব্যবস্থা, যার ফলে সমুদ্রপথে নজরদারি, দূরপাল্লার অনুসন্ধান এবং বিশেষ কমব্যাট অপারেশনের ক্ষেত্রে ভারতীয় নৌবাহিনীর অপারেশনাল ক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এই রণতরীতে সর্বমোট ১৪৮ জন নৌসেনা সদস্য উপস্থিত থাকবেন, যার মধ্যে ২৪ জন অভিজ্ঞ অফিসার এবং ১২৪ জন দক্ষ নাবিক দায়িত্ব পালন করবেন। সুদীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রের বুকে অবিরাম থেকে অপারেশন পরিচালনার সম্পূর্ণ উপযোগী করেই এই শক্তিশালী জাহাজটিকে ডিজাইন করা হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই এনজিওপিভি সিরিজের প্রতিটি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে সম্পূর্ণভাবে দেশীয় প্রযুক্তি, কাঁচামাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কেন্দ্রের সুদূরপ্রসারী ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখেই দেশের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এই নতুন প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজ। সব মিলিয়ে, ভারত মহাসাগরীয় ও তৎসংলগ্ন কৌশলগত অঞ্চলে সমুদ্রসীমা নজরদারি, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করবে এই ‘এনজিওপিভি শ্রুতি’। সমুদ্রপথে দেশের অখণ্ডতা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি জলদস্যু দমন থেকে শুরু করে মানবিক সহায়তা প্রদান—একাধিক বহুমুখী দায়িত্ব পালনে এটি নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।