টাটা সাম্রাজ্যে বিস্ফোরক পদত্যাগ! নটরাজন চন্দ্রশেখরনের বিদায়ে বড় ধাক্কা শিল্পমহলে

শিল্পমহলে তীব্র জল্পনা ও নানা গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত টাটা সন্স থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন সংস্থার চেয়ারম্যান নটরাজন চন্দ্রশেখরন। দীর্ঘ সময় ধরে টাটা ট্রাস্টসের বর্তমান চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা এবং শীর্ষ শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে তাঁর নানাবিধ মতবিরোধ নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে চর্চা চলছিল। সেই রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের আবহেই তাঁর এই চাঞ্চল্যকর পদত্যাগের ঘোষণা সামনে এল। যদিও তিনি তাঁর বর্তমান কার্যকালের নির্দিষ্ট মেয়াদ সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ করবেন বলে জানিয়েছেন, তবে তারপরে আর কোনোভাবেই যে তিনি টাটা গোষ্ঠীতে ফিরে আসতে চান না, সেকথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, প্রয়াত শিল্পপতি রতন টাটার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন চন্দ্রশেখরন, যাঁর প্রয়াণের পর থেকেই টাটা সাম্রাজ্যের অন্দরে সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছিল।

তামিলনাড়ুর নমাক্কল জেলার একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া নটরাজন চন্দ্রশেখরনের এই সুদীর্ঘ পথচলা অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। পরিবারে কোনো বড় শিল্পপতি বা কর্পোরেট সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও নিজের মেধা, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য জেদের জোরে তিনি টাটা গোষ্ঠীর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছন। ১৯৮৭ সালে টিসিএস (TCS)-এ একজন সাধারণ ইন্টার্ন হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিখুঁত কর্মদক্ষতার জেরে তিনি পর্যায়ক্রমে টিসিএস-এর চিফ অপারেটিং অফিসার, সিইও এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালে টাটা সন্সের বোর্ডে নিজের জায়গা পাকা করেন। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে টাটা পরিবারের বাইরের প্রথম কোনো পেশাদার ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদের গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। সাইরাস মিস্ত্রির অপসারণের মতো চরম নেতৃত্ব সংকটের অগ্নিপরীক্ষার দিনে রতন টাটা তাঁর ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

রতন টাটার দীর্ঘ সান্নিধ্যে থেকে টাটা গোষ্ঠীকে প্রযুক্তি, এভিয়েশন, অটোমোবাইল থেকে শুরু করে বহু নতুন ক্ষেত্রে সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছিলেন চন্দ্রশেখরন। এয়ার ইন্ডিয়ার ঘরে ফেরা এবং টিসিএস-কে দেশের অন্যতম লাভজনক সংস্থায় রূপান্তর করার পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। তবে গত বছরের অক্টোবর মাসে রতন টাটার প্রয়াণের পরই টাটা সাম্রাজ্যের অন্দরের ক্ষমতার সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিভিন্ন লাভজনক ও অলাভজনক প্রকল্পে বিশাল বিনিয়োগের যৌক্তিকতা এবং এক্সিকিউটিভ কম্পেনসেশন বা বিপুল বেতন বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে নোয়েল টাটার সঙ্গে তাঁর তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়। এমনকি তাঁর বিলাসবহুল আবাসন ক্রয় এবং ব্যক্তিগত আর্থিক বিষয় নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ চাপ এবং মতবিরোধের জেরে রতন টাটার এই অতি বিশ্বস্ত সৈনিকের বিদায় নিশ্চিতভাবেই ভারতীয় কর্পোরেট জগতের ইতিহাসে একটি বিরাট ও গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করল।