সমুদ্রপথে দুবাই পৌঁছে ইতিহাস গড়ল ভারতের আম! কম খরচে রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত!

ভারতের সুস্বাদু ও জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন ফল আম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছে। উত্তরপ্রদেশ থেকে সংগৃহীত প্রায় ১২.৫ টন খাঁটি ও সুস্বাদু দশেহরি এবং ল্যাংড়া আম প্রথমবারের মতো দীর্ঘ ২৫ দিনের এক সুদীর্ঘ সমুদ্রপথের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাই শহরে এসে পৌঁছেছে। এই পুরো যাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং চমকপ্রদ দিকটি হলো, সুদূর সমুদ্রের বুকে ২৫ দিনের দীর্ঘ ট্রানজিট সময় পার করার পরেও এই চালানের প্রায় ৯০ শতাংশ আম সম্পূর্ণ তাজা ও বাণিজ্যিক বাজারজাতকরণের উপযুক্ত অবস্থায় অক্ষত রয়েছে। এই অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক সাফল্য আগামী দিনে অত্যন্ত কম খরচে, সাশ্রয়ী মূল্যে এবং বিশাল পরিমাণে ভারতীয় আম বিশ্ববাজারের বিভিন্ন প্রান্তে রপ্তানি করার এক সম্পূর্ণ নতুন ও লাভজনক দিগন্ত উন্মোচন করে দিল।
কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আমের এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে লখনউয়ের স্বনামধন্য ‘আইসিএআর–সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট ফর সাবট্রপিক্যাল হর্টিকালচার’ (ICAR-CISH) এবং কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা ‘এপেডা’ (APEDA)-র যৌথ প্রচেষ্টায় উদ্ভাবিত একটি অত্যন্ত আধুনিক ও উন্নত পোস্ট-হারভেস্ট প্রোটোকল। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ও সফল প্রয়োগের ফলে বিশ্ববাজারে আম পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল বিমান পরিবহণ বা এয়ার কার্গোর ওপর থেকে নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে অত্যন্ত কম খরচে সমুদ্রপথের মাধ্যমে নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে প্রিমিয়াম মানের ভারতীয় আম বিদেশে রপ্তানি করা বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণিত হতে চলেছে।
কেন্দ্রের তরফ থেকে প্রকাশিত একটি সুনির্দিষ্ট বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, উত্তরপ্রদেশ থেকে দুবাই পর্যন্ত ২৫ দিনের এই ‘হারভেস্ট-টু-মার্কেট’ ট্রানজিট সময়ের মধ্যে দশেহরি ও ল্যাংড়া আমের এটিই প্রথম পরীক্ষামূলক ও সফল বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের রপ্তানি। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে ফলের গুণমান, স্বাদ ও প্রাকৃতিক সতেজতা পুরোপুরি অক্ষত রেখেই প্রিমিয়াম ভারতীয় আম এখন সাশ্রয়ী মূল্যে সমুদ্রপথে অর্থনৈতিকভাবে রপ্তানি করা সম্পূর্ণ সম্ভব। সরকারের তরফ থেকে প্রবল আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর দেশের অন্যান্য বাণিজ্যক রপ্তানিকারকরাও উপসাগরীয় দেশগুলি সহ বিশ্বের অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে তাজা ফল পাঠানোর জন্য বিমান পরিবহণের পরিবর্তে এই লাভজনক সমুদ্রপথ বেছে নিতে অনেক বেশি উৎসাহিত হবেন। এতে সামগ্রিক পরিবহণ খরচ নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে এবং রপ্তানি ব্যবসা আগের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক হয়ে উঠবে।
কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রকের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান অনুসারে, সমুদ্রপথে আম পরিবহণ করার ক্ষেত্রে যে খরচ হয়, তা গতানুগতিক বিমান পরিবহণের খরচের তুলনায় বহুলাংশে অনেক কম। পরিবহণ খাতের এই বিপুল অর্থ সাশ্রয় হওয়ার ফলে রপ্তানিকারকরা এখন সরাসরি স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে আগের তুলনায় অনেক বেশি ন্যায্য ও চড়া দামে আম ক্রয় করতে সক্ষম হয়েছেন। যার ফলে দেশের সাধারণ আমচাষিরা ফল প্রতি কেজিতে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করতে পেরেছেন, যা তাঁদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক লাভকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, এই আধুনিক প্রযুক্তি কেবল উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভারতের অন্যান্য প্রধান আম উৎপাদনকারী রাজ্যগুলি থেকেও সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক রপ্তানি বহুগুণ বাড়াতে অসামান্য সাহায্য করবে। এতে বিশ্বমঞ্চে নতুন সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের সার্বিক রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে।