পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের রাজনীতির অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন—কোথায় গেলেন প্রাক্তন মন্ত্রী ও হেভিওয়েট নেতা মানস ভূঁইয়া? সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী অমল কুমার পণ্ডার কাছে অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর থেকেই যেন মানচিত্র থেকে মুছে গিয়েছেন এই দাপুটে নেতা। কার্যত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনজীবন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেওয়া মানস ভূঁইয়ার এই অন্তর্ধানকে ঘিরে সবংয়ের হাটে-বাজারে বইছে জল্পনার ঝড়।
এক সময় যে ‘মানস-ভবন’ ছিল সবংয়ের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র, আজ সেখানে নেমে এসেছে এক বুক ভাঙা নীরবতা। ভিকনীনিশ্চিন্তপুরের এই বাড়িটি একদা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড়ে ঠাসা থাকত। দলীয় কর্মী, অনুগামী এবং এলাকার সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য এখানে ছিল অবিরাম কোলাহল। রুদ্ধদ্বার রাজনৈতিক বৈঠক কিংবা এলাকার বিরোধ মিটিয়ে শান্তির বাতাবরণ তৈরি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই প্রাসাদের মতো বাড়িটি। কিন্তু নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ছবিটা পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে এই বিশাল বাড়িতে জনমানবের দেখা পাওয়া দায়। শুধুমাত্র একজন পুরুষ ও একজন মহিলা কর্মী বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং রান্নাবান্নার কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। চেনা সেই রাজনৈতিক কর্মব্যস্ততা আজ কেবলই অতীত।
মানস ভূঁইয়ার এই আকস্মিক অন্তর্ধানের কারণ নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তাঁর দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মুখে কুলুপ আঁটা হলেও, রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন তুঙ্গে। একটি বড় অংশের ধারণা, দীর্ঘদিন সবংয়ের রাজনীতির রাশ হাতে রাখার পর, ক্ষমতা হারানোর তীব্র মানসিক হতাশা থেকেই তিনি আপাতত ‘অজ্ঞাতবাস’ বেছে নিয়েছেন। অনেকের মতে, এই পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় ধাক্কা, যা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে কিছুটা সময় নিচ্ছেন তিনি। আবার অন্য একটি পক্ষ মনে করছে, রাজনীতি থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে ব্যক্তিগত কারণ বা পারিবারিক প্রয়োজনে তিনি দূরে সরে গিয়েছেন। তবে রহস্য কাটছে না, কারণ খোদ তৃণমূল নেতৃত্বের তরফ থেকেও তাঁর অবস্থান নিয়ে মেলেনি কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত।
তবে সবংয়ের সাধারণ মানুষের একাংশের মত সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কোলাহল এবং দাপুটে নেতার ছায়ায় থাকা সবংবাসী এখন অনেক বেশি নিশ্চিন্ত বলে দাবি করছেন। স্থানীয়দের মতে, নির্বাচনের আগে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো, রাজনৈতিক সংঘাতের যে ভয় কাজ করত, মানস ভূঁইয়ার অনুপস্থিতিতে তা এখন অতীত। ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে সবংয়ের মাটি এখন অনেকটাই শান্ত। ক্ষমতা দখলের লড়াই নেই, নেই বারুদে ঠাসা রাজনৈতিক পরিবেশ।
রাজনীতির কারবারিদের একাংশ মনে করছেন, মানস ভূঁইয়ার মতো দক্ষ চাণক্যর এই নীরবতা হয়তো নতুন কোনো কৌশলের ইঙ্গিত। তবে বর্তমান বাস্তব বলছে, মেদিনীপুরের রাজনীতির ময়দানে একসময়ের দাপুটে নেতার এই রহস্যময় নিস্তব্ধতা সবংয়ের মোড়ে মোড়ে চায়ের আড্ডার মূল খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেদিকেই মোড় নিক না কেন, সবংয়ের বর্তমান শান্ত পরিবেশ স্থানীয়দের মনে এক অদ্ভুত স্বস্তি এনে দিয়েছে।





