সকালের ব্যস্ততায় স্তব্ধ হাওড়া-বর্ধমান রুট! রেল ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হতেই স্টেশনে স্টেশনে হাহাকার, যাত্রীদের জন্য বড় আপডেট

অফিসটাইমের অত্যন্ত ব্যস্ততম মুহূর্তে বড়সড় রেল বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন হাওড়া-বর্ধমান মেন শাখার হাজার হাজার নিত্যযাত্রী। আজ শুক্রবার সকালে ভদ্রেশ্বর স্টেশনের নিকটবর্তী এলাকায় একটি রেল ইঞ্জিন হঠাৎ করেই লাইনচ্যুত হয়ে যাওয়ায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইনের আপ পরিষেবা। একইসঙ্গে রিভার্স লাইনেও ট্রেন চলাচল পুরোপুরি থমকে যায়। ফলস্বরূপ, ব্যস্ত সকালে একের পর এক দূরপাল্লার ও লোকাল ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে মাঝপথে আটকে পড়ে। কোথাও তীব্র গরমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে চরম অপেক্ষায় দিন কাটাতে দেখা যায় যাত্রীদের, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অফিস পৌঁছানোর তাগিদে বিকল্প পরিবহণের খোঁজে স্টেশন চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন।
রেল দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গিয়েছে, আজ সকাল প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ ভদ্রেশ্বর স্টেশনের কাছে রিভার্স লাইন থেকে মেন আপ লাইনে একটি রেল ইঞ্জিন তোলার কাজ চলছিল। ঠিক সেই সময়ই আচমকাই ইঞ্জিনটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। ঘটনাটি সম্পূর্ণভাবে ঘটে ভদ্রেশ্বর থেকে ব্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে। এই আকস্মিক ঘটনার জেরে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আপ মেন লাইন এবং রিভার্স লাইনে সমস্ত ধরনের ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় রেল কর্তৃপক্ষ।
এই আকস্মিক দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছন পূর্ব রেলের অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ এবং উচ্চপদস্থ উদ্ধারকারী দল। ভারী যন্ত্রপাতি ও ক্রেন নিয়ে লাইনচ্যুত ইঞ্জিনটিকে দ্রুত ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার কাজ জোরকদমে শুরু হয়। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মেরামতির কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে চললেও, রেল কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী—পরিষেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক করে তুলতে অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
যদিও আপ লাইনের তুলনায় ডাউন লাইনে অত্যন্ত সীমিত আকারে বিক্ষিপ্তভাবে ট্রেন চলাচল কোনোরকমে চালু রাখা হয়েছে, তবুও আপ লাইনের পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় বর্ধমানমুখী হাজার হাজার নিত্যযাত্রী ও চাকুরিজীবীরা চরম দুর্দশার মুখে পড়েছেন। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ লোকাল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যার জেরে গোটা রুটের সমস্ত ট্রেনের নির্ধারিত সময়সূচিও সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে গিয়েছে।
ভদ্রেশ্বর স্টেশনে অসহায়ভাবে অপেক্ষারত নিত্যযাত্রী প্রিয়া ঘোষের আক্ষেপ, “আমার আজ জরুরি কাজে মগরা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ট্রেন পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় স্টেশনেই হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। কখন যে ট্রেন চলবে, রেলের তরফে কেউ নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না।” অপর এক বিপন্ন যাত্রী অরিজিৎ রক্ষিতের কথায়, “অফিসে পৌঁছতে তো ইতিমধ্যেই প্রচুর দেরি হয়ে গিয়েছে। এখন বাধ্য হয়ে এই ভিড়ের মধ্যে বিকল্প গাড়ি ধরতে গেলে অনেক বেশি অতিরিক্ত খরচ হবে। তাই নিরুপায় হয়ে প্ল্যাটফর্মেই অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা রেলের লোকো পাইলট অমিত প্রকাশ বিক্রান্ত জানান, রিভার্স লাইন থেকে মেন লাইনে ইঞ্জিন ওঠানোর প্রাক্কালেই এই বিপত্তি ঘটে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, “আজ সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ ইঞ্জিনটি হঠাৎ লাইনচ্যুত হয়। বর্তমানে আপ এবং রিভার্স—দুটি লাইনেই ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখা হয়েছে। দ্রুত উদ্ধার ও মেরামতির কাজ চলছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে আগামী দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে রেল পরিষেবা স্বাভাবিক করে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।”
তবে ঠিক কী কারণে বা কোন কারিগরি ত্রুটির জেরে রানিং ইঞ্জিনটি লাইনচ্যুত হলো, সে বিষয়ে রেলের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি। উল্লেখ্য, হাওড়া-বর্ধমান মেন শাখা হলো পূর্ব রেলওয়ের অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত ব্যস্ততম রেলপথ। প্রতিদিন এই লাইনের ওপর নির্ভর করে লক্ষাধিক সাধারণ মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে এমন আকস্মিক বিপর্যয়ে গোটা শাখার ট্রেন চলাচল ও জনজীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।