সংসদে তুমুল হৈচৈ, আর বাইরে ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ে মোদীর মহা-মন্ত্রণ! কোন গোপন স্ট্র্যাটেজিতে এগোচ্ছে বিজেপি?

সংসদের বাদল অধিবেশন চলাকালীন তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নিজের সরকারি বাসভবনে এক বিশেষ প্রাতঃরাশ বৈঠকের আয়োজন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বুধবার সকালে ৩৭ জন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এবং শরিক দলের সাংসদদের সঙ্গে এই ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ে মিলিত হন তিনি। মূলত সংসদীয় অধিবেশন চলাকালীন সাংসদদের সঙ্গে পারস্পরিক আলাপচারিতা এবং নীতিনির্ধারণী বার্তা দেওয়ার অংশ হিসেবেই এই ঘরোয়া সভার আয়োজন করা হয়েছিল। এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবনের নানা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সাংসদদের সঙ্গে ভাগ করে নেন এবং এক সুহৃদ ও অভিভাবকের মতো ঘরোয়া আলোচনায় অংশ নেন।
এদিনের বৈঠকে উপস্থিত সাংসদদের তালিকায় এক বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব লক্ষ্য করা গেছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই) জোটের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাংসদ, সম্প্রতি আম আদমি পার্টি (আপ) ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেওয়া একাধিক প্রাক্তন নেতা। পাশাপাশি, দলের সর্বভারতীয় স্তরের বরিষ্ঠ নেতৃত্ব যেমন তরুণ চুগ, বিনোদ তাওড়ে এবং দলের সভাপতি নীতিন নবীনও এই বৈঠকে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন। সংসদীয় রণকৌশল এবং দলীয় সমন্বয় বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই প্রাতঃরাশ বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে মোদীর এই ব্রেকফাস্ট মিটিং এমন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলি সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতি ও বিবৃতির দাবিতে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। জনস্বার্থ ও দেশের বর্তমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি জবাবদিহিতা দাবি করছে। বুধবার সংসদের অধিবেশন শুরু হতেই লাগাতার হট্টগোল ও স্লোগান-পাল্টা স্লোগানের জেরে লোকসভার অধিবেশন দুপুর দুটো পর্যন্ত মুলতুবি করতে বাধ্য হন স্পিকার। রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে সরাসরি সংসদে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে বিবৃতির দাবি জোরালো করেন।
সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে মল্লিকার্জুন খাড়গে সংবাদমাধ্যম ও সংসদের ভেতরে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আমাদের স্পষ্ট দাবি, প্রধানমন্ত্রী মোদীজি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে হাউজে এসে উপস্থিত হতে হবে। তারা নির্দিষ্ট বিষয়ে বিবৃতি দিন, আমরা যেকোনোও গঠনমূলক আলোচনায় বসতে সম্পূর্ণ রাজি আছি। সঠিক ও সুস্থ আলোচনার মাধ্যমেই যে কোনো বড় সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে।” তিনি সরকারকে আক্রমণ করে আরও যোগ করেন, “সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে বেশ কিছুদিন কেটে গেছে, কিন্তু তারা নিয়মিত হাউজে আসছেন না। এইভাবে সদনে অনুপস্থিত থেকে তারা আদতে দেশের সর্বোচ্চ সংসদীয় গণতন্ত্রকে অপমান করছেন।”
অন্যদিকে, সংসদের ভেতরে হট্টগোলের পাশাপাশি বাইরেও লাগাতার প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যান বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের সাংসদরা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা এবং অন্যান্য বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় সাংসদরা এদিন সংসদ চত্বরের প্রেরণা স্থল থেকে গান্ধী মূর্তির পাদদেশ হয়ে মকর দ্বার পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল অথচ তীব্র প্রতিবাদ মিছিল করেন। মূলত গত ২০ জুলাই সংঘটিত সিজেপি বিক্ষোভকারীদের ওপর তথাকথিত ‘পুলিশি পদক্ষেপ’, অযোধ্যা রাম মন্দির অনুদান ও তহবিলে আর্থিক তছরুপের অভিযোগ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জনস্বার্থের নানা জ্বলন্ত ইস্যুকে সামনে রেখেই এই বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল। সবমিলিয়ে, একদিকে প্রধানমন্ত্রীর ঘরোয়া প্রাতঃরাশ বৈঠক এবং অন্যদিকে বিরোধীদের তীব্র সংসদীয় প্রতিবাদের জেরে জাতীয় রাজধানী দিল্লির রাজনীতি বর্তমানে চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।