সংসদের অন্দর থেকে রাজপথ উত্তাল! প্রশ্নফাঁস নিয়ে কড়া পদক্ষেপের ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী

দেশজুড়ে পরীক্ষার্থীদের লাগাতার তুমুল বিক্ষোভ এবং সংসদের উভয় কক্ষে শাসক ও বিরোধী শিবিরের তীব্র রাজনৈতিক তরজার মাঝেই এবার সরাসরি আসরে নামলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পাকাপাকিভাবে রুখতে এবং এর সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার সকালে নিজের সরকারি সোশ্যাল মিডিয়া এক্স (X) হ্যান্ডেলে একটি সুনির্দিষ্ট পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, প্রশ্নফাঁসের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধে যুক্ত কুচক্রীদের দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে কেন্দ্র সরকার দেশের বিচার ব্যবস্থায় বিশেষ ‘ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট’ (Fast Track Court) গঠন করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজের বার্তায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে লিখেছেন, “আমাদের দেশের উদীয়মান যুবসমাজের সামগ্রিক কল্যাণ ও তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে দ্রুত ও কঠোরতম আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দিতে আমরা বিশেষ ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে সমস্ত প্রয়োজনীয় এবং কঠোর পদক্ষেপ দ্রুত রূপায়ণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে, সেই অপরাধীদের রাষ্ট্রীয় স্তরে কোনোভাবেই রেহাই দেওয়া হবে না। এর আগে উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ বৈঠকে এই ধরনের সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও দুর্নীতিকে ‘ঘোর পাপ’ বলেও তীব্র ভর্ৎসনা করেছিলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর এই বড় ঘোষণা এমন এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এল, যখন নিট-ইউজি (NEET-UG) ও অন্যান্য সমস্ত সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকাণ্ড নিয়ে জাতীয় রাজধানী দিল্লির রাজপথ থেকে শুরু করে সংসদের অন্দরমহল—সবত্রই চরম উত্তেজনা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলির ধারাবাহিক বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং অন্যদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পদক্ষেপের ঘটনা এই বিক্ষোভের আগুনকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

বিশেষ করে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি অত্যন্ত জোরালোভাবে আক্রমণ শানিয়ে দাবি করেছেন যে, বিগত এক দশকে দেশে দেড় শতাধিকবার বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে একটি ক্ষেত্রেও মূল অপরাধীদের কোনো কঠোর সাজা হয়নি। আইনি প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রিতা ও ধীরগতির সুযোগ নিয়েই অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে, আর সেই ফাঁকফোকর বন্ধ করতেই মূলত এই বিশেষ ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠনের পথ বেছে নিয়েছে কেন্দ্র।

এদিকে বিরোধীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, সংসদীয় আলোচনার টেবিলে বসার আগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিতে হবে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে সংসদীয় আলোচনার এক ধরণের পূর্বশর্ত হিসেবে স্থির করেছে বিরোধী শিবির। এর জেরে সংসদের উভয় কক্ষেই তীব্র ডেডলক তৈরি হয়েছে। সরকার পক্ষের মন্ত্রীদের দাবি, তারা যেকোনো গঠনমূলক ও যৌক্তিক আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, কিন্তু বিরোধী দলগুলি রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য মন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অনড় থেকে সংসদীয় কাজকর্ম স্তব্ধ করে রাখছে।

দেশজুড়ে ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবমূর্তি রক্ষায় এই ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠনকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে মামলা ঝুলে থাকার প্রথার অবসান ঘটবে এবং দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে রাজনৈতিক পারদ যে এই মুহূর্তে নামছে না, তা পরিষ্কার। একদিকে রাজপথে শিক্ষার্থীদের নায্য দাবি এবং অন্যদিকে সংসদে বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণ—এই দুইয়ের জটিল পরিস্থিতির মাঝে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠনের মাস্টারস্ট্রোক দেশের শিক্ষাঙ্গনে কতটা স্বস্তি আনতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।