সংরক্ষণে আসছে না কোনো বড় বদল! এসসি, এসটি এবং ওবিসি কোটা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বড় সাফাই কেন্দ্রের

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আলোচিত একটি বিষয় হলো সংরক্ষণ নীতি। তফশিলি জাতি (SC), উপজাতি (ST) এবং অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণি (OBC)-র জন্য চালু থাকা ঐতিহ্যবাহী সংরক্ষণের নিয়মে বড় রকমের কোনো পরিবর্তন বা বিশেষ আর্থিক মানদণ্ড যুক্ত করা হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্টে চলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দাখিল করা এক কড়া হলফনামায় এই অবস্থান স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের এই জবাবের ফলে দীর্ঘদিনের জল্পনা এবং আইনি বিতর্কের অবসান ঘটল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইনি লড়াইয়ের নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু জনস্বার্থ মামলা। রামশঙ্কর প্রজাপতি, আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায় এবং ‘সমতা আন্দোলন সমিতি’-সহ একাধিক মামলাকারী শীর্ষ আদালতে আবেদন জানিয়েছিলেন যে, এসসি, এসটি এবং ওবিসি কোটার ভেতরেও উপ-শ্রেণিবিভাগ (Sub-classification) বা সাব-কোটা চালু করা হোক। তাঁদের মূল দাবি ছিল, একই সম্প্রদায়ের ভেতরে যারা তুলনামূলকভাবে বেশি দরিদ্র এবং সুবিধাবঞ্চিত, সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে তাদেরই যেন প্রধানত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ওবিসি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ‘ক্রিমি লেয়ার’ বা আর্থিক স্বচ্ছলতার মাপকাঠির বিধানটিও সম্পূর্ণ তুলে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রের মোদী সরকার এই সমস্ত দাবি একযোগে খারিজ করে দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রবর্তনের প্রথম থেকেই দেশের পিছিয়ে পড়া তফশিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের জন্য শিক্ষা এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা চলে আসছে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, এসসি এবং এসটি তালিকার অন্তর্ভুক্ত কোনো ব্যক্তি পরিবারের আর্থিক অবস্থা যাই হোক না কেন, জীবনের যেকোনো পর্যায়ে এই সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকারী। তাঁদের ক্ষেত্রে কোনো আয়সীমা বা আর্থিক মানদণ্ড বিচার করা হয় না। অন্যদিকে, ওবিসি বা অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণির ক্ষেত্রে প্রতি রাজ্যভিত্তিক আলাদা আর্থিক মানদণ্ড ও ক্রিমিলিয়ারের নিয়ম প্রযোজ্য রয়েছে, যাতে আর্থিকভাবে উন্নত ব্যক্তিরা এই সুবিধার বাইরে থাকেন। মামলাকারীরা এই ক্রিমিলিয়ারের বিধান বাতিলের দাবি তুললেও কেন্দ্র তা মানতে নারাজ।

সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকের মাধ্যমে দাখিল করা বিশদ হলফনামায় কেন্দ্র আরও যুক্তি দিয়েছে যে, দেশের বর্তমান সংরক্ষণ নীতির কোনো রকম পুনর্বিন্যাস বা সংস্কারের জন্য বিচার বিভাগীয় নির্দেশ চাওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সরকারের মতে, এই ধরনের নীতি নির্ধারণ বা আইন প্রণয়নের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নির্বাহী ও আইন বিভাগের এক্তিয়ারভুক্ত। আদালত এই বিষয়ে সরাসরি কোনো নির্দেশ জারি করতে পারে না। সংবিধানের ৩৪০, ৩৪১, ৩৪২ এবং ৩৪২এ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, এসসি, এসটি এবং এসইবিসি (SEBC)-র তালিকা নির্ধারণ কেবল অর্থনৈতিক অবস্থার মাপকাঠিতে হয় না; বরং এর পেছনে রয়েছে সুদূর প্রসারিত ঐতিহাসিক, সামাজিক অনগ্রসরতা এবং জাতভিত্তিক বঞ্চনার সুদীর্ঘ প্রেক্ষাপট।

কেন্দ্রীয় সরকার এই মামলাগুলিকে সম্পূর্ণ ‘ভুল ধারণাপ্রসূত’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই আবেদনগুলিতে এমন কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বা সাংবিধানিক ত্রুটির বিষয় তুলে ধরা হয়নি যার জন্য সুপ্রিম কোর্টকে বিশেষ হস্তক্ষেপ করতে হবে। মোদী সরকারের এই অবস্থানকে বিরোধীরা ভিন্ন চোখে দেখার চেষ্টা করলেও, হলফনামায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে সরকার বর্তমান সংরক্ষণ কাঠামোকে আরও সুরক্ষিত রেখেই চলতে বদ্ধপরিকর।