শুভেন্দুর ভূয়সী প্রশংসা শান্তনু সেনের! তৃণমূলে অস্বস্তি বাড়িয়ে কি বিজেপির পথে প্রাক্তন সাংসদ?

রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে পালাবদলের পর থেকেই একের পর এক নতুন সমীকরণ সামনে আসছে। এবার নতুন বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গৃহীত স্বাস্থ্যনীতির প্রশংসা করে শোরগোল ফেলে দিলেন প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ তথা বিশিষ্ট চিকিৎসক নেতা শান্তনু সেন। যদিও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে নয়, বরং ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (IMA)-এর রাজ্য সম্পাদক হিসেবেই তিনি এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, তবুও তাঁর এই পোস্টকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জল্পনার ঢেউ।

শনিবার গভীর রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে শান্তনু সেন রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নে বর্তমান সরকারের নেওয়া একাধিক জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের প্রশংসা করেন। তিনি লেখেন, “চিকিৎসা আন্দোলনের দীর্ঘদিনের সৈনিক এবং আইএমএ-র সর্বভারতীয় সভাপতি ও বেঙ্গল স্টেট ব্রাঞ্চের বর্তমান রাজ্য সম্পাদক হিসেবে আমি বাংলার নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে স্বাস্থ্যখাতে এই ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।” একজন প্রাক্তন তৃণমূল নেতা এবং দীর্ঘদিনের তৃণমূল ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শান্তনু সেনের এই প্রকাশ্য সমর্থন শাসকদলের অন্দরে অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

শান্তনু সেনের এই অবস্থানের পেছনে থাকা ইতিহাস বেশ নাটকীয়। একসময়ের তৃণমূলের প্রথম সারির মুখপাত্র এবং রাজ্যসভার সাংসদ শান্তনু আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে মহিলা চিকিৎসকের মর্মান্তিক ঘটনার পর দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেন। ওই ঘটনায় তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে তিনি জুনিয়র চিকিৎসকদের ঐতিহাসিক আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এমনকী ‘রাতদখল’ কর্মসূচিতেও তাঁর প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল, যার জেরে একসময় দল তাঁকে সাসপেন্ডও করেছিল। পরবর্তীতে তৃণমূলে ফিরলেও দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন কখনোই পুরোপুরি কাটেনি।

অন্যদিকে, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার দুর্নীতি ও ‘থ্রেট কালচার’ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আরজি কর কাণ্ডের জেরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমনে নতুন সরকার শুরু থেকেই বিশেষ তৎপরতা দেখাচ্ছে। হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং পরিষেবা স্বচ্ছ করতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো চিকিৎসক মহলে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে শান্তনু সেনের মতো একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক নেতার নতুন সরকারের স্বাস্থ্যনীতিকে ‘জনকল্যাণমুখী’ বলে সার্টিফিকেট দেওয়াটা বিজেপির কাছে একটি বড় রাজনৈতিক প্রাপ্তি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেস এখন কার্যত দিশেহারা। দলের অন্দরের অনেক নেতাই এখন পূর্বতন সরকারের ভুলভ্রান্তি নিয়ে মুখ খুলছেন। নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান অনেক নেতাই এখন বিজেপির কার্যপ্রণালীকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। শান্তনু সেনের এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে কি নিছকই পেশাগত সৌজন্য বলা যায়? নাকি এটি তাঁর সরাসরি পদ্মশিবিরে যোগদানের প্রথম পদক্ষেপ? সেই জল্পনাই এখন রাজ্যের রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয়। একদিকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরানোর লড়াই, আর অন্যদিকে রাজনৈতিক দলবদলের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে শান্তনু সেনের এই পদক্ষেপ আগামী দিনে নতুন কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি না, তা সময়ই বলবে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy