শুধু কেরিয়ার নয়! কোন গোপন কারণে একা থাকাকেই সেরা বেছে নিচ্ছেন আধুনিক ভারতীয় নারীরা?

ভারতে অবিবাহিত মহিলার সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই প্রবণতার পেছনে কেবল কেরিয়ার বা উচ্চাশাই একমাত্র কারণ নয়। জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর (NSO)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ভারতে অবিবাহিত মহিলার হার যেখানে ছিল ১৩.৫ শতাংশ, ২০২১ সালে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৯.৯ শতাংশ। কেন এই পরিসংখ্যান লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে? এর সহজ অর্থ এই নয় যে সব মহিলা সচেতনভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তবে একটি বড় সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে আগের তুলনায় অনেক দেরিতে বিয়ে হচ্ছে, অথবা বিয়ে আর জীবন ও সমাজের আবশ্যিক অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। অনেকের ক্ষেত্রে আর্থিক স্বনির্ভরতা ও নিজস্ব উপার্জন বিয়ের আর্থিক বাধ্যবাধকতাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। আবার অন্যদিকে সংসারের সার্বিক দায়িত্ব, মাতৃত্ব নিয়ে নানা প্রত্যাশা এবং বিয়ের পর নিজেদের কেরিয়ারের স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা অনেক নারীর কাছেই বিয়ের সিদ্ধান্তকে এক জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছে।
বিয়ের করার প্রবণতা কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হচ্ছেন মহিলারা: টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের সবথেকে বড় কারণ হলো বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই দেশের বিপুল সংখ্যক নারী নিজেদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তুলছেন। কেন্দ্রের ‘অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন ২০২১-২২’ এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় ছাত্রীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৭ লক্ষ। ২০১৪-১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৭ লক্ষ। একই সঙ্গে মহিলাদের গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও বা জিইআর ২২.৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৮.৫ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত হওয়া মানেই যে কোনো নারী বিয়ে করবেন না এমন নয়, তবে এর ফলে বিয়ের আগে তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত সময়, নিজস্ব আয় এবং স্বাধীনভাবে জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ অনেকটাই প্রশস্ত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, বিয়ে এখন আর তাঁদের কাছে একমাত্র আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম হয়ে থাকছে না।
সংসারের কাজ ও দায়িত্ব নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন: শুধু টাকা বা কেরিয়ার নয়, ভারতীয় পরিবারগুলির অন্দরেও মানসিকতার আমূল বদল ঘটছে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি বা পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলে অফিস থেকে ফেরার পর সংসারের অবিরাম কাজগুলি কে করবে? টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘টাইম ইউজ সার্ভে ২০১৯’ অনুযায়ী, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সেবায় মহিলারা বেতন ছাড়া প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৯৯ মিনিট গৃহস্থালীর কাজে ব্যয় করেন। যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই সময় মাত্র ৯৭ মিনিট। একইভাবে মহিলারা প্রতিদিন গড়ে ১৩৪ মিনিট পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন, অথচ পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা মোটে ৭৬ মিনিট। এই বিশাল ব্যবধান ও বৈষম্য বিয়ের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাইরে দীর্ঘ আট ঘণ্টার কর্মঘণ্টার পরও একজন বিবাহিত নারীর কাছ থেকে রান্না করা, ঘর পরিষ্কার রাখা, সংসার সামলানো, সন্তানদের দেখাশোনা করা এবং শ্বশুরবাড়ির যাবতীয় দায়িত্ব এক হাতে পালনের চিরাচরিত প্রত্যাশা তৈরি হয়। যাঁরা এই ধরনের গতানুগতিক ধারণা বা মানসিকতা থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ দূরে রাখতে চান, তাঁদের কাছে বিয়ের পর এই প্রত্যাশাগুলোর সঙ্গে সারাজীবন লড়াই করার চেয়ে একা স্বাধীনভাবে থাকা অনেক বেশি সহজ বলে মনে হচ্ছে।
সঙ্গী বাছাইয়ের মাপকাঠিতে বড় বদল: ২০২৪ সালের একটি বিশিষ্ট ডেটিং সাইটের সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ৬৪ শতাংশ মহিলা উত্তরদাতা জানিয়েছেন—তাঁরা ঠিক কী চান এবং একজন সঙ্গীর কাছ থেকে তাঁদের কী প্রয়োজন, সে বিষয়ে তাঁদের ধারণার স্পষ্টতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে তাঁরা কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই আর অযথা আপস করতে রাজি নন। এর অর্থ এই নয় যে মহিলারা সার্বিকভাবে বিয়ে করতে চাইছেন না, বরং সম্পর্ক ও বৈবাহিক জীবনের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একটি বিয়ে যদি ক্রমাগত আপস, পাহাড়প্রমাণ দায়িত্ব কিংবা নিজের অমূল্য স্বাধীনতা হারানোর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে বহু নারীর কাছেই বিয়ের বন্ধনে জড়ানোর চেয়ে একা থাকা অনেক শ্রেয় বিকল্প হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবারে যদি কোনো অসফল বা টক্সিক বৈবাহিক সম্পর্কের বাস্তব উদাহরণ থাকে, তবে সেই পরিবারের তরুণীদের মধ্যে এই স্বাধীন মানসিকতা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সাধারণত ভারতীয় পরিবারগুলিতে বিয়ের পর কেরিয়ারে দীর্ঘ বিরতি, সন্তান পালনের একচ্ছত্র দায়িত্ব কিংবা প্রতিটি পদক্ষেপে নারীকে নিজেদের মানিয়ে নিতে বা ‘অ্যাডজাস্ট’ করতে বলা হয়। তাই বহু নারীই নতুন করে ভাবছেন যে তাঁরা সত্যিই নিজেদের জীবনে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে চান কি না।
দেরিতে বিয়ের প্রবণতা: ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS)-এর তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি বিশেষ গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সি ভারতীয় নারীদের গড় বিয়ের বয়স ছিল মাত্র ১৬.২ বছর। কিন্তু ২০১৯-২১ সালের মধ্যে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯.২ বছরে। বিয়ের আগের এই বহুমূল্য সময়টুকু মহিলারা এখন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, চাকরি এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার পেছনে ব্যবহার করছেন। আর বিয়ে যত বেশি দেরিতে হচ্ছে, তত দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখতে পারছেন যে তাঁরা আদৌ আর বিয়ে করতে চান কি না।
একা থাকার ক্ষেত্রে সামাজিক লড়াই ও বাধ্যবাধকতা: যদিও বর্তমান সময়ে অনেক নারীর পক্ষেই আর্থিকভাবে একা জীবন কাটানো আগের চেয়ে কিছুটা সহজ হয়েছে, তবুও সামাজিকভাবে এই বিষয়টি এখনও যথেষ্ট জটিল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। অবিবাহিত মহিলাদের এখনও সমাজ, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বাড়ি ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার, স্বাস্থ্য পরিষেবা, সন্তান ধারণ কিংবা সন্তান দত্তক নেওয়ার মতো নানা কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তবে সচেতন মহিলারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে একা হাতেই করছেন। স্বামী কিংবা সন্তানই বার্ধক্যের একমাত্র ভরসা বা অবলম্বন হবে—এই পুরনো ধারণার বদলে তাঁরা এখন নিজস্ব সঞ্চয়, শক্তপোক্ত সম্পত্তি এবং সুদৃঢ় স্বাস্থ্য পরিষেবা বিষয়গুলিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। সমাজ যতই আধুনিক হওয়ার দাবি করুক না কেন, ভারতে বিয়ে নিয়ে মানুষের আদিম ধ্যানধারণা ও মানসিকতা এখনও পুরোপুরি আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি। এখানে বিয়ে আজও পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে ওপ্রোতোভাবে যুক্ত। কিন্তু এতকিছুর পরেও একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নই বারবার জোরালো হয়ে উঠছে—জীবন সুন্দরভাবে কাটানোর জন্য বা সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য কি সত্যিই বিয়ের কোনো অপরিহার্যতা রয়েছে? ‘অবিবাহিত’ তকমাটি এখন আর কোনো বড় সমস্যা বা অভিশাপ নয়, বরং বহু নারীর কাছে এটি হয়ে উঠেছে নিজেদের পছন্দমতো স্বাধীনভাবে জীবন কাটানোর একটি দুর্দান্ত উপায়।