শিল্পের পথে বাধা সিন্ডিকেট ও তোলাবাজি! সরকারি দপ্তরের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ‘দাদাগিরি’

পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের স্বপ্ন চিরকালই এক বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বাম আমলের শেষলগ্নে হোক বা তৃণমূল সরকারের দেড় দশকের শাসনে—রাজ্যে বড় বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে বারবার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অদৃশ্য দেওয়াল। তথাকথিত ‘পরিবর্তন’-এর স্লোগান দিয়ে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় এলেও, শিল্পের পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সিন্ডিকেট রাজ ও তোলাবাজির দাপট। শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির পরিবর্তে রাজ্যে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে সরকারি দপ্তরের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে তৃণমূল স্তরের রাজনৈতিক দলের দাদাগিরি।

রাজ্যে কোনো নতুন উদ্যোগ বা শিল্প প্রকল্প ঘোষণা করার পরপরই স্থানীয় স্তরে তৈরি হয় সিন্ডিকেট চক্র। সরকারি নিয়ম-নীতি কিংবা প্রশাসনিক অনুমোদন ছাপিয়ে সেখানে প্রাধান্য পায় রাজনৈতিক পরিচয়। ইট, বালি, পাথর সরবরাহ থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজের ঠিকাদারি—সবই এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ইশারায়। যার ফলে, ভিন রাজ্যের বড় বিনিয়োগকারীরা এ রাজ্যে পা রাখতে গিয়ে পিছু হটছেন। শিল্পপতিদের মতে, সরকারি দপ্তরে ফাইলের গতি যতটা না শ্লথ, তার চেয়েও অনেক বেশি শ্লথ তাদের কাজ, কারণ প্রতিটি ধাপে দিতে হয় ‘পলিটিক্যাল কাটমানি’ বা তোলা।

তৃণমূল আমলে সরকারের ইমেজের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দাদাগিরি। স্থানীয় পর্যায়ে ছোট থেকে বড় প্রতিটি কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তারা সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রশাসন সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেও স্থানীয় রাজনৈতিক চাপের মুখে তারা অসহায়। শিল্প স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সংযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপ শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। অথচ উন্নয়নের দাবি করা হলেও বাস্তবের চিত্রটা একেবারে উল্টো। কর্মসংস্থানের আশায় থাকা বেকার যুবকরা সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে হতাশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক স্থায়িত্ব। কিন্তু গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গে সিন্ডিকেটরাজ এমনভাবে শিকড় গেড়েছে যে, তাকে উপড়ে ফেলা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন উন্নয়নের চেয়ে দলের কর্মীদের আয়ের পথ বা দাদাগিরিকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন শিল্প সেখানে গৌণ হয়ে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গেলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং প্রশাসনিক কঠোরতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, শিল্পের নামে শুধু প্রতিশ্রুতিই সার হবে, আর বাস্তবের মাটিতে কোনো বড় শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।