শতবর্ষে স্মরণ মহানায়ককে: উত্তম কুমারের কোন জাদুকরী গুণের কথা তুলে ধরলেন নরেন্দ্র মোদী?

বৃহস্পতিবার ভারতীয় চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি এবং বাঙালির ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমারের জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এদিন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ একটি বিশেষ পোস্টের মাধ্যমে প্রয়াত অভিনেতাকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উত্তম কুমার এমন একজন ‘কালজয়ী আইকন’ যাঁর অনবদ্য সৃষ্টি এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনয়শৈলী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে চলেছে। বিশেষ এই দিনটিতে প্রধানমন্ত্রী গত রবিবার তাঁর জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’-এ মহানায়ককে নিয়ে করা মন্তব্যের একটি ভিডিও ক্লিপও জনসমক্ষে শেয়ার করেছেন।
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে জন্মগ্রহণ করা এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব পরবর্তীকালে বাংলা সিনেমার জগতে ‘মহানায়ক’ হিসেবে চিরকালের মতো অমরত্ব লাভ করেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বর্ণাঢ্য কেরিয়ারে তিনি শুধুমাত্র একজন অভিনেতা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং একাধারে পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার এবং সুরকার হিসেবেও বাংলা বিনোদন জগতকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। ১৯৪৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে একটি ছোট চরিত্রের মাধ্যমে অভিনয় জীবন শুরু করলেও তাঁর প্রথম দিকের বেশ কয়েকটি ছবি বক্স অফিসে সফল হয়নি। তবে অদম্য জেদ ও পরিশ্রমের জোরে ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ ছবির মাধ্যমে তিনি প্রথম বক্স অফিসে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেন এবং পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
গত রবিবার ‘মন কি বাত’-এর ১৩৭তম পর্বে প্রধানমন্ত্রী মোদী উত্তম কুমারকে একজন অত্যন্ত বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্ন শিল্পী হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “৩ সেপ্টেম্বর আমরা কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের জন্মশতবার্ষিকী পালন করছি। একজন বহুমুখী শিল্পী হিসেবে তিনি তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন এবং মানুষের হৃদয়ে এক স্থায়ী আসন অর্জন করেছেন।” ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় এবং উত্তম কুমারের ঐতিহাসিক জুটির অবিস্মরণীয় অবদানের কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের বিশ্বাস, ১৯৬৬ সালে নির্মিত কালজয়ী ছবি ‘নায়ক: দ্য হিরো’-র মূল চিত্রনাট্য সত্যজিৎ রায় সম্পূর্ণভাবে মহানায়ক উত্তম কুমারকে মাথায় রেখেই লিখেছিলেন। সত্যজিৎ রায় স্বয়ং একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, মহানায়কের চরিত্রের মধ্যে অসাধারণ আবেগপ্রবণ গভীরতার পাশাপাশি এক অনন্য মার্জিত ভাব ছিল এবং পর্দার চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতে তিনি অসম্ভব পরিশ্রম করতেন। খ্যাতির অন্তরালে থাকা মানসিক চাপ এবং মানুষের জীবনের জটিলতাকে ফুটিয়ে তোলা এই ছবিতে উত্তম কুমারের অভিনয় আজও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা মাস্টারপিস হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৬৭ সালে ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন, যা তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক। অভিনয়ের বাইরেও তাঁর জনহিতকর কাজ এবং চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মানসিকতা তাঁকে অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল। জন্মশতবার্ষিকীতে মহানায়ককে ঘিরে এই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন প্রমাণ করে যে, শতবর্ষ পরেও বাঙালির হৃদয়ে তাঁর আবেদন আজও সমানভাবে অটুট।