লোকসভা আসন বাড়লে কি বড় বিপদে পড়বে দক্ষিণ ভারত? সীমানা পুনর্নির্ধারণ ঘিরে দেশজুড়ে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা!

ভারতে লোকসভা আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ (Delimitation) এবং সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি ছাড়িয়ে গেলেও গত কয়েক দশকে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩-এ স্থির রয়েছে। এর ফলে বর্তমানে একজন সাংসদের নির্বাচনী এলাকায় গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ মানুষ বসবাস করছেন, যা জনপ্রতিনিধিদের কাজের উপর বিপুল চাপ তৈরি করছে। তবে এই আসন বাড়ানোর উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করছে কংগ্রেস এবং দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্য। তাদের মূল উদ্বেগ আসন সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে নয়, বরং নতুন আসনগুলির বণ্টন পদ্ধতি এবং এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া নিয়ে।

এই পুরো বিতর্কের সূত্রপাত ১৯৭৭১ সালের আদমশুমারির সঙ্গে। ১৯৭৬ সালে সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোকসভা আসনের পুনর্বণ্টন দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল যে রাজ্যগুলি পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা যেন রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সেই থেকে উত্তরপ্রদেশ, বিহারের মতো জনবহুল রাজ্যগুলির তুলনায় দক্ষিণের রাজ্যগুলি ১৯৭১ সালের ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিধিত্ব ধরে রেখেছে। কিন্তু বিগত ৫৫ বছরে ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪৭৬ মিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশেষ করে তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মতো দক্ষিণী রাজ্যগুলি জন্মহার সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখলেও, উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন নতুন জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ করা হলে দক্ষিণের রাজ্যগুলির লোকসভার আসন সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কংগ্রেস নেতা শশী থারুর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৮২৪ বা ৮৫০ করা হলে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির রাজনৈতিক প্রভাব একলাফে অনেক বেড়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি দিয়ে আগামী ২৫ বছরের জন্য বর্তমান ৫৪৩টি লোকসভা আসনই অপরিবর্তিত রাখার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, মহিলা সংরক্ষণ বিল বাস্তবায়নের জন্য আসন সংখ্যা বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই বলেই দাবি করছে বিরোধী শিবির। অন্যদিকে, শাসক দল বিজেপির যুক্তি হলো, ১৯৭১ সালের পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে ১৪০ কোটির ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিকভাবে সঠিক নয়। সংবিধানের ৮২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সবমিলিয়ে, এই লড়াইটি কেবল আসন সংখ্যা বাড়ানোর নয়, বরং ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার এক তীব্র লড়াই।