লাখো ভক্তের উলুধ্বনি, চারদিকে জয় জগন্নাথ ধ্বনি! রথের চাকায় ভর করে মাসির বাড়ি চললেন মহাপ্রভু

আজ আষাঢ়ের শুক্লা দ্বিতীয়া। পুরীর নীল সমুদ্রের তীরে এক অনন্য উৎসবের আমেজ। ভোর থেকেই শ্রীমন্দির চত্বর পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে। জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের কয়েক লক্ষ ভক্ত সমবেত হয়েছেন ওড়িশার পুরীতে। বিকেল ৪টেয় মূল আকর্ষণ—সেই পবিত্র রথের দড়ি টানার মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ মহাপ্রভুর রথযাত্রা মানেই অশুভ শক্তির বিনাশ আর ভক্তদের অন্তরে নতুন ভক্তির উন্মেষ।
ভোর ৬টায় মঙ্গল আরতির মাধ্যমেই আজকের উৎসবের সূচনা হয়েছে। শাস্ত্রীয় রীতি মেনে মৈলম, তড়প লাগি, রোষ হোম, অবকাশ, সূর্যপুজো এবং দ্বারপাল পুজোর পর সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয়েছে ‘পাহান্ডি’ পর্ব। এই বিশেষ আচারে গর্ভগৃহ থেকে দেবমূর্তিগুলিকে সুসজ্জিত রথে অধিষ্ঠিত করা হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে এই আচার সম্পন্ন হওয়ার কথা। এরপর পুরীর রাজকীয় ঐতিহ্যে ‘ছেরা পাহানরা’ সহ যাবতীয় রীতি পালন করে বিকেল ৪টেয় ভক্তদের উন্মাদনার মধ্য দিয়ে শুরু হবে রথ টানা।
রথযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি গুণ্ডিচা মন্দিরে যাওয়ার এক পবিত্র যাত্রা। শাস্ত্রমতে, এই বিশেষ দিনটিতে দেবতা নিজেই মন্দির থেকে বেরিয়ে মানুষের মধ্যে আসেন, যাতে সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে দর্শনের সুযোগ পান। এখানেই রথযাত্রার সর্বজনীনতা। পুরীর রথযাত্রার অন্যতম বিশেষত্ব হলো, প্রতি বছর নতুন কাঠ দিয়ে নতুন করে রথ তৈরি করা হয়। এছাড়া রথের দড়ি টানার ক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ নেই; ধর্ম, বর্ণ বা জাতি নির্বিশেষে যে কেউ এই পুণ্য কর্মে অংশ নিতে পারেন। এটিই আমাদের সমতা ও একতার বার্তা দেয়।
আগামী ২০ জুলাই পালিত হবে বহুড়া যাত্রা বা দেবদেবীর প্রত্যাবর্তন। এরপর ২৪ জুলাই সোনা বেশ, ২৬ জুলাই আধর পান এবং ২৭ জুলাই নীলাদ্রি বিজের মাধ্যমে এবারের রথযাত্রা উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ওড়িশা প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি সিসিটিভি ও ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে পুরীর প্রতিটি কোণায় চলছে কড়া নজরদারি। ট্র্যাফিক ও জননিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ পরিকল্পনায় মুড়ে ফেলা হয়েছে পুরো শহর।
ভক্তদের অদম্য বিশ্বাস, এই রথযাত্রার দড়িতে হাত দেওয়া মানেই জীবনের সমস্ত গ্লানি ধুয়ে মুছে ফেলা। আজ শ্রীক্ষেত্র জুড়ে শুধুই জগন্নাথের নাম। রথের চাকা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হবে আধ্যাত্মিক এক নতুন অধ্যায়। আকাশে-বাতাসে এখন একটাই ধ্বনি— ‘জয় জগন্নাথ’।